জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকটের প্রভাব পড়েছে নাটোরের মোটরসাইকেল বাজারে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। ফলে নতুন মোটরসাইকেল কেনার আগ্রহ হারাচ্ছেন গ্রাহকরা। আকর্ষণীয় ছাড় ও উপহার দিয়েও বিক্রি বাড়াতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে কদর বেড়েছে ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক বা ই-বাইকের।
মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) নাটোর শহরের বিভিন্ন এলাকার মোটরসাইকেলের শোরুম ঘুরে দেখা যায় ক্রেতা না থাকায় অনেকটা অলস সময় পার করছেন মোটরসাইকেল শোরুমের বিক্রয়কর্মীরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে অন্যান্য বছর বাড়তি বিক্রি হয়। এবারও বিক্রি বাড়াতে নগদ ডিসকাউন্ট, উপহার ও ক্যাশব্যাকসহ নানা অফার দিয়েছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটে সব চেষ্টাই যেন বৃথা যাচ্ছে।
শহরের ভবানীগঞ্জ মোড় এলাকায় হিরো ব্র্যান্ডের অনুমোদিত ডিলার নিউ আলম মটরসের ম্যানেজার সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দেওয়া হচ্ছে। অথচ বিক্রি কমে অর্ধেকে নেমেছে। গড়ে প্রতি মাসে আমাদের ৫০-৬০টি বাইক বিক্রি হয়, ঈদের মাসে যা দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কিন্তু তেলের সংকটে এবারের ঈদের মাসে মাত্র ৩০টি বাইক বিক্রি হয়েছে।
একই অবস্থা সুজুকি, বাজাজ, টিভিএস ও হোন্ডা ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে। হোন্ডার অনুমোদিত ডিলার মেসার্স গণি এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার রুবেল হোসেন বলেন, লাখ টাকা খরচ করে নতুন গাড়ি কিনে কেউই তেলের জন্য রোদে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল দিতে চাইছেন না। ক্রেতারা শোরুমে আসার আগে ফোন করে জানতে চাইছেন আমরা তেলের ব্যবস্থা করে দিতে পারব কি না। আমরা নিজেরাই তেল পাচ্ছি না। ব্যবসার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান চান তিনি।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের এই সংকট যেন সাপে বর হয়ে ধরা দিয়েছে ইলেকট্রিক বাইক বা ই-বাইক বিক্রেতাদের কাছে। জ্বালানিচালিত বাইকের বিক্রি কমলেও চাহিদা বেড়েছে ই-বাইকের।
ই-বাইক ব্র্যান্ড ইয়াদিয়ার নাটোর বিক্রয়কেন্দ্র এমএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ জানান, তেলের সংকটের ফলে মানুষ ইলেক্ট্রিক বাইকের দিকে ঝুঁকছে। চলতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারী মাসে কোনো বাইক বিক্রি হয়নি। তবে, চলতি মাসেই তার ৭টি বাইক বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে গত ৭ দিনেই বিক্রি হয়েছে ৪টি।
তিনি বলেন, তেল না পেয়ে এবং ই-বাইকের সুবিধা বুঝতে পেরে আগে থেকে তেলের বাইক ব্যবহার করছেন এমন গ্রাহকও আমাদের থেকে ই-বাইক কিনছেন। তেলের সংকট আরও দীর্ঘ হলে ই-বাইকের চাহিদা আরও বাড়বে বলে আশা করেন এই ব্যবসায়ী।
একই প্রত্যাশার কথা জানান টেইলজি ব্রান্ডের বিক্রয় প্রতিনিধি আবির হাসান শুভ। তিনি বলেন, ইলেকট্রিক বাইক ৬-৭ ঘণ্টা চার্জ দিলে ১০-১৫ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হয়। সামান্য এই খরচেই মডেলভেদে বাইকগুলো ৮৫ থেকে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে সক্ষম। যা তেলের বাইকের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ইলেকট্রিক বাইকের দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ইলেকট্রিক বাইকের বিক্রি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া জ্বালানি তেল সরবরাহে বিধিনিষেধ থাকলেও নাটোরে এখনো এমন কোনো নিয়ম আরোপ করা হয়নি। ফলে মোটরসাইকেল নিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন স্বাভাবিক রয়েছে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ নাটোর সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক উত্তম কুমার দেবর্শমা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সড়কে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে গাড়ির কাগজ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ও চালকদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান চলছে। সবাইকে লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে।
ই-বাইকের লাইসেন্স প্রয়োজন আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ইলেক্ট্রিক বাইক রেজিস্ট্রেশনে এখনো পর্যন্ত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। ইবাইক রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেলে তবেই আমরা রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু করতে পারব।