শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০১৬, ০৯:৫০:২৭

খাদিজার সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষা

 খাদিজার সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষা

নিউজ ডেস্ক: স্কয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন খাদিজা বেগম নার্গিসের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। অচেতন খাদিজা ভেন্টিলেটর মেশিনের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের পরিচালক ডা. মীর্জা নাজিম উদ্দিন বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা খাদিজাকে বাঁচিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। লাইফ সাপোর্টে থাকা খাদিজার মাথায় মঙ্গলবার বিকালে অস্ত্রোপচার করা হয়। তারপর থেকে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি বা অবনতি কোনোটিই হয়নি। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি বা উন্নতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
 
বৃহস্পতিবার সৌদি আরব থেকে দেশে এসেছেন খাদিজার বাবা মাসুক মিয়া ও ভাই শাহিন আহমেদ। মেয়ের পাশি দাঁড়িয়ে বাবা চেয়েছেন দেশবাসীর কাছে দোয়া। সেই সঙ্গে বদরুল আলমের বিচার চেয়েছেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মাসুক মিয়া।
 
বদরুলের ফাঁসির দাবিতে বৃহস্পতিবারও বিক্ষোভ আর স্লোগানে উত্তাল ছিল সিলেট মহানগরী। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে এদিন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মো. আমিনুর রহমান ওই স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। এ সময় দাবি পূরণে পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত (১০ দিনের জন্য) আন্দোলন স্থগিত করেন। তবে এর আগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র ফজিলাতুন্নেসাকে হত্যার হুমকি দেয় অজ্ঞাত ব্যক্তি/সংগঠন। ফজিলাতুন্নেসা যখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আন্দোলনে, তখন তার মায়ের মোবাইলে অপরিচিত নম্বর থেকে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে ওই হুমকি দেয়া হয়। বলা হয়, আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে ফজিলাতুন্নেসাকেও খাদিজার মতো কোপানো হবে। এরপর থেকেই আতংকে রয়েছে তার পরিবার।
 
বৃহস্পতিবারও মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি খাদিজাকে দেখতে হাসপাতালে যান। স্কয়ারে আসেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল ইসলামও। তিনি বলেন, বদরুলের উপযুক্ত বিচার করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জমে থাকা উদ্বেগ কমবে। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্যও দোষীর উপযুক্ত বিচার দাবি করেন তিনি। সিলেটে খাদিজার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন জেলা ও মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
 
এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানেও বদরুলের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। ঢাকায় জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ও কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে।
 
প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট : সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা তিন দিনের কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করে। বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে। জিন্দাবাজার-চৌহাট্টা-আম্বরখানা সড়ক অবরোধ করে। শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘খাদিজার ওপর আক্রমণ, জবাব চাই প্রশাসন’, ‘নারী নির্যাতন যেখানে, লড়াই হবে সেখানে’ ইত্যাদি। বেলা ১১টায় তারা মিছিল নিয়ে সিলেট জেলা প্রশাসকের দফতরে যান। প্রধানমন্ত্রী বরাবরে দেয়া স্মারকলিপি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মো. আমিনুর রহমান শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন, আপনাদের দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। দাবি পূরণে পদক্ষেপও নেয়া হবে।
 
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র ফজিলাতুন্নেছা বলেন, ওই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ১০ দিনের জন্য আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। তবে বদরুলের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আমরা দ্রুত বিচার দেখতে চাই, নিরাপত্তা চাই নারীদের।
 
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ করেন মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা। সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষে অ্যাডভোকেট শিরিন আক্তার বলেন, বর্বরোচিত পাশবিক এই ঘটনার দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। খাদিজার ওপর হামলার ঘটনাস্থল এমসি কলেজ ক্যাম্পাসেও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ হয়েছে খাদিজার গ্রাম সদর উপজেলার মোগলগাঁওয়ের আউশাতেও। গ্রামবাসীর উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। ফাঁসির দাবি জানিয়ে ছাপানো হয়েছে লিফলেট। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গ্রামবাসী সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন। কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামলে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হামলাকারী বদরুলের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মসূচি চলাকালে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজামাল নুরুল হুদা। বক্তব্য রাখেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান জৈন উদ্দিন, অধ্যক্ষ সুজাত আলী রফিক, কান্দিগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, মোগলগাঁওয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আশিক মিয়া ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম। সিলেটে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জৈন্তিয়া ছিন্নমূল সংস্থা (জেছিস), ‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জেলা জোট ও এশিয়া ছিন্নমূল মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন। দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে সরকারি মহিলা কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট এ. জেড রওশন জেবীন রুবার সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন ফরিদা নাসরিন, সালমা বাছিত, কুমকুম হাজেরা মারুফা, সামিয়া বেগম প্রমুখ। এ সময় একাত্মতা পোষণ করে বক্তব্য রাখেন সাবেক মেয়র কামরান আহমেদের পত্নী আসমা কামরান। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা মানববন্ধনে অংশ নেন। দুপুরে ওসমানী মেডিকেল কলেজ রোডে মঈন উদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজের ছাত্রীরা মানববন্ধন করেন। এ সময় বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হেনা সিদ্দিকী, অধ্যাপক সুপর্ণা রায়, পার্থ সারথী নাগ প্রমুখ।
 
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসবে সিসি ক্যামেরা : শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সিলেটের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মো. আমিনুর রহমান। শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি গ্রহণকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার ছুটির পর সিলেট ব্ল–বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো প্রতিষ্ঠানকেই এর আওতায় আনা হবে। ১৩ অক্টোবর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
 
আতংকে ফজিলাতুন্নেসার পরিবার : ফজিলাতুন্নেসাকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ফজিলাতুন্নেছার মায়ের মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এরপর থেকে তার মা আতংকে কান্নাকাটি করছেন এবং মেয়ের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। তবে ফজিলাতুন্নেসা বলেন, হুমকি-ধমকি দিয়ে আমাদের আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না।
 
খাদিজার পরিবারের পাশে মহিলা আওয়ামী লীগ : সিলেট জেলা ও মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগ নেতারা বৃহস্পতিবার দুপুরে আউশায় খাদিজার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানান। এ সময় মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আসমা কামরান, সালমা বাছিত, এজেড রওশন জেবিন রুবা, মাধুরী গুন, সাজেদা পারভীন, কোহিনুর সুলতানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তারা খাদিজার হামলাকারী ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাবেন বলে পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেন।
 
প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সোমবার সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে উপর্যুপরি কুপিয়ে আহত করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাবি ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। খাদিজা বর্তমানে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় বদরুল আলমকে আসামি করে হত্যা চেষ্টার মামলা করেন। ওই মামলায় বদরুল এখন কারাগারে।-যুগান্তর
০৭ অক্টোবর,২০১৬/এমটি নিউজ২৪ ডটকম/এইচএস/কেএস

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে