বিচিত্র জগৎ ডেস্ক : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিয়ের রীতিনীতি সাধারণত আনন্দ, নাচ, গান ও উদযাপনার মাধ্যমে পালন করা হয়। কিন্তু চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের টুজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন এক অনন্য রীতি প্রচলিত আছে, যেখানে কনের বিয়ের ঠিক আগে থেকে প্রতিদিন কাঁদা বা কাঁদিয়া গান গাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। প্রথমে এটি দুঃখজনক মনে হলেও এর পেছনে আছে ঐতিহ্য, আবেগ এবং সামাজিক মূল্যবোধ। এই প্রথাকে চীনে ক্রাইং ম্যারেজ বলা হয়।
এই প্রথা কিং রাজবংশের শেষ যুগ (১৬৪৪–১৯১১) পর্যন্ত এটি ব্যাপকভাবে পালন করা হত। যদিও আধুনিক শহুরে জীবনে এর জনপ্রিয়তা অনেক কমে গেছে, গ্রামীণ এলাকায় এবং পাহাড়ি সম্প্রদায়ে এখনো কনের বিয়ের আগে কান্না করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি হিসেবে বিদ্যমান।
প্রথাটি মূলত কনের আবেগ, পরিবার, সামাজিক প্রত্যাশা এবং নতুন জীবনের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রকাশ। এটি শুধু চোখের জল নয়; বরং একটি সংগীতমাধ্যমে প্রকাশিত ঐতিহ্যবাহী গান বা ক্রাই সং হিসেবে পরিবেশিত হয়। কনে এই গানগুলো নিজে শিখে অথবা রচনা করে গায়, এবং এতে তার জীবনের আনন্দ, দুঃখ, পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক দায়িত্বের প্রতিফলন ঘটে।
প্রথার সময়কাল ময়কালও বৈচিত্র্যময়। অনেকে বিয়ের এক মাস আগে থেকে নিয়মিত কাঁদা শুরু করে, আবার কিছু অঞ্চলে দুই থেকে তিন মাস আগে থেকেই এই প্রথা পালিত হয়। বিয়ের এক মাস আগে কনে রাতে একটি বিশেষ হলে বা ঘরে চলে যায় এবং এক ঘণ্টা ধরে কাঁদে। দশ দিন পর তার মা তার সঙ্গে কাঁদতে শুরু করে এবং আরও দশ দিন পর দাদি-নানি বা অন্যান্য বয়স্ক নারীরাও এতে যোগ দেন। কনের বোন, খালা বা অন্যান্য আত্মীয়রা প্রয়োজনে এতে অংশগ্রহণ করে। এই ক্রমকে জুও তাং বা হলে বসে থাকা হিসেবে পরিচিত।
কিছু এলাকায় টেন সিস্টার গ্যাদারিং নামে কনের বন্ধু ও আত্মীয়রা মিলে একত্রিত হয়, যেখানে সবাই মিলে কাঁদে এবং গান গায়। এটি কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং পরিবারের বন্ধন, সামাজিক সহমর্মিতা এবং এক নতুন জীবনের প্রতি শুভাশীষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রথার মূল উদ্দেশ্য শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়। এটি কনের আবেগ, সামাজিক প্রতিবাদ, পরিবারপ্রেম এবং নতুন জীবনের আশা প্রকাশের একটি মাধ্যম। প্রাচীন সময়ে মেয়েদের বিবাহ সাধারণত পিতামাতার বা ঘটকের মাধ্যমে নির্ধারিত হতো, তাই কনের নিজস্ব ইচ্ছার প্রকাশ সীমিত থাকত। এই পরিস্থিতিতে কান্নার মাধ্যমে কনে তার অসন্তুষ্টি, হতাশা এবং প্রত্যাশা প্রকাশ করত। প্রথার সময় কনের কান্না প্রায়শই গান বা লিরিক্সের সঙ্গে যুক্ত হতো, যা স্থানীয় অপেরা এবং লোকশিল্পেও প্রতিফলিত হত।
প্রাচীন সমাজে, কনে যথেষ্ট কান্না না করলে তাকে সামাজিকভাবে সমালোচিত করা হতো এবং দরিদ্র বা অশিক্ষিত মেয়ে হিসেবে দেখা হত। এমনকি ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে কনের মা তাকে শাস্তি দিতেন। কনের কান্না প্রায়শই ঘটককে তিরস্কার করার মাধ্যমে ব্যক্ত হত, যা তাদের অসন্তোষ এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতার প্রতি বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে গণ্য হত।
তাই এই সমাজে কান্নাকাটি প্রথা কেবল দুঃখের প্রতীক নয়; এটি কনের সামাজিক মর্যাদা, পরিবারিক সম্পর্ক, ঐতিহ্য এবং নতুন জীবনের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। গ্রামীণ অঞ্চলে এটি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা হয়, যেখানে কনের আবেগ, আশা এবং সামাজিক দায়িত্ব প্রকাশ পায়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই রীতির গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান আধুনিক চীনে শহুরে এলাকায় এই প্রথা কম হলেও গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে এখনও সুদৃঢ়ভাবে পালিত হয়। টুজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি কেবল একটি আবেগঘন অনুষ্ঠান নয়, বরং পরিবার, সম্প্রদায় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রথার মাধ্যমে কনে তার পূর্বজন্মের ইতিহাস, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নতুন জীবনের সূচনা একত্রিতভাবে প্রকাশ করে। সূত্র: ডেইলি চায়না