আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ বা শুল্ক ঘোষণার পর থেকেই মার্কিন ডলারের দরপতন শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন ২০২৬ সালে বাজার কিছুটা শান্ত হবে। কিন্তু নতুন বছরের শুরুতেই সেই আশায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
গত মঙ্গলবার বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইউরো এবং পাউন্ডের বিপরীতে ডলারের এই বড় পতন মার্কিন অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘খামখেয়ালি’ পররাষ্ট্রনীতি এবং গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ দখল নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনাই বিনিয়োগকারীদের ডলারের ওপর থেকে আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডলার তার মানের প্রায় ৩ শতাংশ হারিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা ‘ডলার হেজিমোনি’র জন্য বড় এক হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডলার ছিল বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। চলতি মাসে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকির ফলে ইউরো ও পাউন্ডের বিপরীতে ডলারের মান কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে পৌঁছেছে।
আইএনজির ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট রিসার্চের প্রধান ক্রিস টার্নার বলেন, বাজার এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে ডলারের এই পতন কেবল শুরু। পতনের অভিমুখ নিয়ে এখন আর কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই। ডলার ইনডেক্স বর্তমানে ৯৭ পয়েন্টের নিচে অবস্থান করছে, যা ২০১৭ সালের পরবর্তী সবচেয়ে দুর্বল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডলারের এই দরপতন সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদেশ ভ্রমণে আমেরিকানদের ক্রয়ক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনি আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর যে পরিকল্পনা করছিল, তা এখন নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবিন ব্রুকস মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থিতিশীল নীতিমালার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন সোনা বা সুইস ফ্রাঙ্কের মতো বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ঝুঁকছেন। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক এই কৌশলবিদের মতে, ওয়াশিংটনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এখন অন্য সবার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই বেশি ক্ষতি করছে।
তবে সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে ডলারের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য নিয়ে। ব্রিকস দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধি এবং চীনের ‘সোয়াপ লাইন’ ব্যবস্থার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে ডলারের অংশ গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। যদি এই ধারা ২০২৬ সালজুড়ে অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
যদিও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বাজারকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, তবুও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধের ডামাডোল এবং ট্রাম্পের ‘উইক ডলার’ পলিসি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।