আন্তর্জাতিক ডেস্ক : স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মজুরি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদেশি কর্মীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে মালয়েশিয়া সরকার। চলতি বছরের ১ জুন থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন নিয়মে তিনটি প্রফেশনাল ক্যাটাগরি ভিসার শর্তাবলীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
২০৩৫ সালের মধ্যে মোট শ্রমশক্তিতে বিদেশিদের হার বর্তমানের ১৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই ‘জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে সাধারণ ক্যাটাগরির শ্রমিক (পিএলকেএস) ভিসার নিয়ম আগের মতোই বহাল থাকবে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, তিনটি প্রফেশনাল ক্যাটাগরিতেই ন্যূনতম বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে রয়েছে;
ক্যাটাগরি-১ (উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপনা): এই স্তরের কর্মীদের ন্যূনতম মাসিক বেতন হতে হবে ২০ হাজার রিঙ্গিত বা তার বেশি। চুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত এবং তারা স্ত্রী-সন্তান সাথে রাখার সুযোগ পাবেন।
ক্যাটাগরি-২ (মধ্যম পর্যায়ের পেশাদার): এই ক্যাটাগরিতে বেতনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে মাসে ১০ হাজার থেকে ১৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত। তারাও সর্বোচ্চ ১০ বছর অবস্থান করতে পারবেন এবং পরিবার আনার অনুমতি পাবেন।
ক্যাটাগরি-৩ (দক্ষ কর্মী): দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে মাসিক বেতন ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিতের মধ্যে হতে হবে। তাদের ভিসার মেয়াদ হবে মাত্র ১ বছর (সর্বোচ্চ দুইবার নবায়নযোগ্য) এবং সাধারণত তারা পরিবার বা ডিপেনডেন্ট আনার সুযোগ পাবেন না।
হঠাৎ নেয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘমেয়াদে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করা বিদেশি পেশাজীবীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ৫ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশটিতে থাকা অনেক প্রবাসী জানিয়েছেন, এই নীতি তাদের বাড়ি বা গাড়ি কেনা এবং স্থায়ী হওয়ার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, অর্থায়ন ও তেল-গ্যাস খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত দক্ষ বিদেশিরা এখন বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর কথা ভাবছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কঠোর নীতি মালয়েশিয়ায় ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি করতে পারে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ডগলাস গ্যান জানান, চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে এই উচ্চ বেতন কাঠামো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।
অন্যদিকে কেনাঙ্গা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থনীতি গবেষণা প্রধান ওয়ান সুহাইমি সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি কর্মী কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়দের সেই শূন্যস্থান পূরণের মতো দক্ষ করে গড়ে তোলাটাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরি না হলে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বিদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা নয়, তাদের নিয়োগ যেন স্থানীয় মেধার বিকাশে সহায়ক হয় তা নিশ্চিত করা।
কর্মকর্তাদের মতে, স্বল্প মজুরির বিদেশি শ্রমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং স্থানীয়দের মজুরি বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। যদিও কিছু প্রবাসী এই জাতীয়তাবাদী নীতিকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে।