আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উদ্দেশে এবার আপত্তিকর ভাষায় হুমকি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না করলে মঙ্গলবার ইরানের সবকিছু গুঁড়িয়ে এক করে দেওয়া হবে।
তবে এ হুমকি উড়িয়ে দিয়ে ইরান পালটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য সামনে বড় চমক অপেক্ষা করছে। আগ্রাসী হামলা যদি অব্যাহত থাকে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য তাদের জন্য ‘নরক হয়ে উঠবে’। এদিকে ইরানে যৌথ বাহিনীর হামলার ৩৭তম দিনে পালটাপালটি হামলা অব্যাহত ছিল। বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরার।
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সময় মঙ্গলবার রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালে এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘মঙ্গলবার, রাত ৮টা ইস্টার্ন টাইম!’
এই সময়সীমা অনুযায়ী, তেহরানের স্থানীয় সময় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টা এবং গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) মঙ্গলবার রাত ১২টা (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা)। এর আগে ট্রুথ সোশ্যালে একটি গালাগালপূর্ণ পোস্ট করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি তাতে লিখেছেন, মঙ্গলবার হবে ইরানের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র আর সেতু দিবস, সবকিছু গুঁড়িয়ে এক করে দেওয়া হবে, এরকম আর হয়নি। এখনই (হরমুজ) প্রণালি খুলে দাও, পাগল বেজন্মারা, না হলে তোমাদের জাহান্নামে পড়তে হবে। শুধু দেখ, আল্লাহর কাছে দোয়া কর।
ইরানের অবকাঠামোতে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, চুক্তি করতে রাজি না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে আমি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে তেলসম্পদ দখল করার কথা বিবেচনা করছি।’ তিনি বলেন, ‘শিগগিরই আপনারা দেখবেন পুরো ইরানজুড়ে সেতু আর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধসে পড়ছে।’
তবে এই চরম হুমকির মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেছেন, কিছু ইরানি কর্মকর্তা এখন আলোচনার টেবিলে রয়েছেন। সোমবারের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। ট্রাম্প এর আগেও হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, সোমবারের মধ্যে এটি খুলে না দিলে তিনি ইরানে ‘জাহান্নাম’ নামিয়ে আনবেন। তিনি আগেও এমন হুমকি দিয়েছেন।
এদিকে তার এ হুমকি উপেক্ষা করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামনে ‘বড় চমক’ আছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, চলমান যুদ্ধে তেহরান পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং তাদের ‘বিশেষ টার্গেট ব্যাংক’ রয়েছে। যেগুলোতে হামলা চালালে চমকে যাবে মার্কিনি ও ইসরাইলিরা।
রোববার ফার্স নিউজকে তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জায়গাগুলো নির্ভুল নয়’। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ব্রিজে হামলার যে হুমকি দিয়েছেন সেটাকে তিনি ‘হাস্যকর’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, মার্কিনিদের সামরিক অভিযান ব্যর্থ এবং তাদের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার কারণে এখন তারা ব্রিজের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সরকারের জন্য আমাদের বড় চমক আছে। একটু অপেক্ষা করলেই তারা চমক দেখবে। দক্ষিণ ইরানে তারা যা করছে, সেখানকার পরিস্থিতিও হয়তো আমাদের অনুকূলে চলে আসবে। গেরিলা ও অসম যুদ্ধে কীভাবে শত্রুদের হারাতে হয় আমরা খুব ভালোভাবে শিখেছি। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পরিষ্কার, দ্রুত এবং সহজ হামলা চালিয়ে আমাদের পরাস্ত করবে। কিন্তু তাদের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে।’
এর আগে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শান্তিচুক্তি মেনে না নিলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার ট্রাম্পের হুমকি প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেনারেল আলি আবদোল্লাহি আলিয়াবাদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এ হুমকিকে ‘অসহায়, স্নায়ুচাপগ্রস্ত, ভারসাম্যহীন ও নির্বোধ পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘মার্কিন-জায়নবাদী শত্রু যদি কোনো আগ্রাসন চালায়, তাহলে আমরা কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই মার্কিন সন্ত্রাসী বাহিনীর সব অবকাঠামো এবং জায়নবাদী শাসনের অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালাব।’
এছাড়া হামলা অব্যাহত থাকলে, অচিরেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য তাদের জন্য ‘নরক হয়ে উঠবে’ বলে শনিবার সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর খাতাম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফগারি।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলছেন, ইরানের ইস্পাতশিল্প ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা করা হয়েছে যাতে তারা অস্ত্র তৈরিতে বাধার সম্মুখীন হয়। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী সংবাদমাধ্যমগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত বৃদ্ধির বিষয়ে এরই মধ্যে ব্রিফিং চলছে। কারণ মনে হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে ইরানের পাওয়ার গ্রিড ও জ্বালানি সম্পদে আঘাত হানার অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব হামলার বিষয়ে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে চলমান পরিস্থিতিতে ইরানে যৌথ বাহিনীর হামলা চলছে। ইরানও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আবুধাবির বোরুজ পেট্রোকেমিক্যাল কারখানার একাধিক স্থানে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ বলেছে, রোববার ভোরে আমিরাতের আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি শনাক্ত করে এবং সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করে। হামলা প্রতিহত করার পর ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন লাগার পর পেট্রোকেমিক্যাল ক্ষেত্রের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে কেউ হতাহত হননি। ড্রোন হামলার পর কুয়েতের শুয়াইখ অয়েল সেক্টর কমপ্লেক্সেও আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। কুনা জানিয়েছে, এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ মিললেই কেবল হরমুজ খুলবে : যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পেলেই কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ইরান। রোববার ইরানের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের যোগাযোগবিষয়ক উপ-প্রধান সাইয়্যেদ মেহদি তাবাতাবায়ী ওই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি হয়ে চলাচলকারী জাহাজের ট্রানজিট ফির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তাবাতাবায়ী বলেছেন, ট্রাম্প আজ প্রণালি বন্ধের জেরে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার যে হুমকি দিয়েছেন, তা আসলে চরম হতাশা আর ক্ষোভ থেকে আসা অশ্লীলতা ও আজেবাজে কথা ছাড়া আর কিছু নয়।