আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কানাডার নাগরিকত্ব আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে লাখ লাখ আমেরিকানের জন্য দেশটির নাগরিক হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন আইনের কারণে নিজের পূর্বপুরুষের সন্ধানে এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের আবেদন জমা দিতে সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মিনেসোটা, ম্যাসাচুসেটস এবং নেভাডার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোর বাসিন্দারা এখন বিপুল সংখ্যায় কানাডিয়ান নাগরিকত্বের সনদ পেতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আগে কানাডার নিয়ম ছিল যে নাগরিকত্ব কেবল এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সরাসরি স্থানান্তরিত হবে, অর্থাৎ কেবল মা বা বাবার মাধ্যমে সন্তান নাগরিকত্ব পেত। তবে নতুন ‘বিল সি-৩’ এই সীমাবদ্ধতা দূর করে দিয়েছে। এখন যদি কারো দাদা-দাদি বা তারও আগের কোনো সরাসরি পূর্বপুরুষ কানাডিয়ান হয়ে থাকেন, তবে তিনিও নাগরিকত্বের দাবিদার হতে পারবেন। এই পরিবর্তনের ফলে অনেক আমেরিকান হঠাৎ করেই জানতে পেরেছেন, তারা জন্মগতভাবেই কানাডার নাগরিক হিসেবে বিবেচিত, যা তাদের জন্য একটি বড় চমক।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অভিবাসন আইনজীবীরা জানিয়েছেন, নতুন আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তারা গ্রাহকদের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারের এক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ জানান, আগে যেখানে তিনি বছরে মাত্র শ’দুয়েক নাগরিকত্ব বিষয়ক মামলা সামলাতেন, এখন সেখানে প্রতিদিন ২০টিরও বেশি পরামর্শ সভা করতে হচ্ছে। অনেক আইনজীবী তাদের অন্যান্য নিয়মিত কাজ সরিয়ে রেখে কেবল এই নাগরিকত্ব আবেদনের কাজগুলোকেই এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এই গণ-আবেদনের পেছনে কেবল আইনি সুবিধা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা পালন করছে বলে জানা গেছে। অনেক আমেরিকান নাগরিক মনে করছেন যে তাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়ি দিন দিন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডার নাগরিকত্ব থাকাকে তারা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং বিকল্প আশ্রয় হিসেবে দেখছেন, যাতে পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে তারা সহজেই অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন।
মিনেসোটার জ্যাংক লাউড নামের এক আবেদনকারী জানান, তার স্ত্রী এবং তিনি আগে থেকেই দেশের বাইরে চাকরি খোঁজার কথা ভাবছিলেন কিন্তু নতুন আইনের খবর পাওয়ার পর কানাডা তাদের তালিকার শীর্ষে চলে এসেছে। তার দাদি কানাডিয়ান হওয়ায় তিনি ও তার ভাইবোনরা এখন সরাসরি নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হয়ে উঠেছেন। জ্যাংকের মতো হাজারো মানুষ এখন তাদের পারিবারিক শিকড় খুঁজে বের করে সেই সংযোগ প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।
তবে নাগরিকত্বের এই প্রক্রিয়া সবার জন্য সমান সহজ বা সস্তা নয়। যাদের হাতে সব নথিপত্র প্রস্তুত আছে, তাদের জন্য আবেদন ফি মাত্র ৭৫ কানাডিয়ান ডলার হলেও জটিল ক্ষেত্রে আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। ম্যাসাচুসেটসের এক নারী জানিয়েছেন, তার আইনি সহায়তা নিতে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ডলার খরচ হতে পারে। আবার অনেকে অনলাইনের বিভিন্ন ফোরাম দেখে নিজেরাই আবেদন করছেন, যা অনেক সাশ্রয়ী বলে তারা দাবি করছেন।
কানাডার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে যে নতুন আইন চালুর প্রথম দেড় মাসেই প্রায় দেড় হাজার মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে আবেদনকারীর সংখ্যা এতই বেড়েছে যে একটি সার্টিফিকেটের জন্য প্রায় দশ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। বর্তমানে ৫৬ হাজারেরও বেশি আবেদন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলে আছে।
কানাডার সাধারণ মানুষ সাধারণত অভিবাসীদের প্রতি অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে থাকেন। তবে অটোয়ার কার্লটন ইউনিভার্সিটির একজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন যে অনেক কানাডিয়ান নাগরিকত্বের এই হিড়িক নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। তাদের ভয় হলো, যারা কেবল সুবিধার জন্য নাগরিক হতে চান কিন্তু কানাডার সাথে যাদের তেমন কোনো আত্মিক টান নেই, তারা আসল শরণার্থীদের বা প্রকৃত প্রয়োজন যাদের তাদের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারেন। সূত্র: এপি