আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখন যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ইন্টারসেপ্টর ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার খবর আসছে, ঠিক তখন বহুজাতিক বাহিনী গড়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। মূলত ড্রোন হামলার জন্য নতুন এ জোট গড়বে তারা। ওই বাহিনীর নাম দেওয়া হয়েছে ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স।
সেন্টকম জানিয়েছে, এই বাহিনীতে আকাশে, পানির ওপর এবং পানির নিচে পরিচালিত ড্রোন অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এটি মার্কিন বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অংশীদারদের অংশগ্রহণে গঠন করা হবে।
গত সপ্তাহে সেন্টকম জানায়, তারা ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বাহিনীতে যোগদানের জন্য অঞ্চলটির দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর কাজ চলছে। তবে তারা কোনো দেশ বা সম্ভাব্য অংশীদারের নাম প্রকাশ করেনি।
সেন্টকমের পরিকল্পনা হচ্ছে, এই বাহিনীতে আকাশে, পানির পৃষ্ঠে এবং পানির নিচে পরিচালিত একবার ব্যবহারযোগ্য মানববিহীন আক্রমণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও অঞ্চলটির দেশগুলোর সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত হবে। বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ও কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বও সেন্টকমের স্পেশাল অপারেশনসের সেন্ট্রাল কমান্ডকে দেওয়া হয়েছে।
সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দূরপাল্লার গোলাবারুদ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
যদিও পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস জোর দিয়ে বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ এখনো রয়েছে। একই সঙ্গে, ইরানের হামলা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থায়ী ঘাঁটি ও অবকাঠামোর দুর্বলতাও উন্মোচন করেছে।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক স্টেসি পেটিজন বিবিসি ফার্সিকে বলেন, ড্রোন দূরপাল্লার হামলা পরিচালনা করা সহজ করে তুলেছে। সেনা বা উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর কাছে না নিয়ে দূর থেকে হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে ‘সামরিক ঘাঁটি, বেসামরিক অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’
পেটিজনের মতে, সস্তা এবং প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এমন ব্যবস্থাগুলো ‘আক্রমণকারীর পক্ষে ভারসাম্য বদলে দিয়েছে’ কারণ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা অনেক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ব্যয়বহুল এবং সংখ্যায় সীমিত।
সেন্টকমের নতুন পরিকল্পনাকে এই সমস্যার আংশিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, উন্নত ও ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান এবং জাহাজের অস্ত্রভাণ্ডারের সঙ্গে আরও বেশি সস্তা আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা যুক্ত করার একটি চেষ্টা এটি।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির স্টেসি পেটিজনও এই অসামঞ্জস্যকে নতুন মার্কিন ড্রোন বাহিনী গঠনের প্রচেষ্টার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতে কম খরচের ড্রোন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, অথচ সেগুলো মোকাবিলার অনেক বিদ্যমান ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং সংখ্যায় সীমিত।
মাটি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ড্রোন, নৌযান এবং পানির নিচে মানববিহীন ব্যবস্থাসহ ছোট ও ছড়িয়ে থাকা বাহিনী শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করা কঠিন। আর সেগুলো ধ্বংস হলেও কম খরচের কারণে ক্ষতি সামাল দেওয়া সহজ।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এই অঞ্চলে তাদের শান্তিকালীন ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করছে। পারস্য উপসাগরের ঘাঁটিগুলোর ইরানের নিকটবর্তী অবস্থান বিবেচনায়, আমি মনে করি না যে এই ঘাঁটিগুলোতে মানবচালিত বিমান ও জাহাজ মোতায়েন আগের মতো অব্যাহত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্যালকন স্ট্রাইক পরিকল্পনার সম্ভাব্য একটি সুবিধা হলো, কয়েকটি বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি এবং প্ল্যাটফর্মের ওপর মার্কিন আক্রমণক্ষমতার নির্ভরতা কমানো। ড্রোন এবং মানববিহীন নৌযান বিভিন্ন স্থান ও প্ল্যাটফর্ম থেকে মোতায়েন করা যেতে পারে।
তবে পেটিজন জোর দিয়ে বলেন, এর কোনো নিখুঁত সমাধান নেই। তার মতে, সস্তা ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থা, স্থাপনার সুরক্ষা জোরদার এবং প্রতিরূপ ও ছলনামূলক উপকরণের ব্যবহার ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু কিছু ঝুঁকি থেকেই যাবে।
ইরানের কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় অংশগ্রহণ, এমনকি সুবিধা ও ঘাঁটি সরবরাহেরও একই পরিণতি হবে। তাই কিছু দেশ হয়তো শুধু প্রশিক্ষণ, সামুদ্রিক নজরদারি বা অবকাঠামো প্রতিরক্ষায় অংশ নেবে, কিন্তু ফ্যালকন টাস্ক ফোর্সের কাঠামোর মধ্যে আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকবে।