রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৪:২৫

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল নেপালের বন্যায় সেই বাড়িতে আটকা পড়া মানুষগুলোর?

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল নেপালের বন্যায় সেই বাড়িতে আটকা পড়া মানুষগুলোর?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হঠাৎ করেই চারদিক থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে কাদামিশ্রিত পানির স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে পানির তোড়ে বাড়িঘর, গাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যেতে থাকে। এর মধ্যেও হালকা সবুজ রঙের একটি বাড়ি তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। বাড়িটির বারান্দায় আতঙ্কিত অবস্থায় কয়েকজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, ভিডিওটি নেপালের ত্রিশুলি নদীর আশপাশের এলাকার। ভয়াবহ বন্যার সময় কয়েকজন ওই বাড়ির বারান্দায় আটকা পড়েছিলেন। বাড়ির ছাদে থাকা এক নারীকে সাহায্যের সংকেত হিসেবে লাল কাপড় নাড়াতেও দেখা যায়।

তবে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাদের পরবর্তী পরিস্থিতি দেখা যায়নি। বিবিসি ভেরিফাইও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে ভিডিওর দৃশ্য দেখে বোঝা যায়, ভয়াবহ স্রোতের মধ্যে পরিবারটি কোনোভাবে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছিল।

পরে পানির প্রবল স্রোত কিছুটা কমলে উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছান। ভিডিওতে অন্তত তিনজনকে দেখা যায়—একজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশু। তাদের চারপাশ দিয়ে তখনও প্রচণ্ড বেগে কাদামাটি ও পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। স্রোতের সঙ্গে বড় বড় পাথর, ধ্বংসাবশেষ এবং বিভিন্ন বাড়ির টিনের চালও ভেসে যেতে দেখা যায়।

পানির সঙ্গে ভেসে আসা বিভিন্ন বস্তু বারবার বাড়িটিতে আঘাত করছিল। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বাড়িটিও স্রোতে ভেসে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাই তৈরি হয়েছিল। আতঙ্কের মধ্যে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে অসহায় দেখাচ্ছিল। এ সময় একজন নারী ছাদে উঠে লাল কাপড় নেড়ে সাহায্যের সংকেত দেন। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

বন্যা থেকে বেঁচে ফেরাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

বুধবারের ভয়াবহ বন্যার পরপরই ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থাপন করা বিভিন্ন ক্যাম্পে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে প্রতিদিন ভিড় করছেন মানুষ। অনেকেই প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

৪৩ বছর বয়সি সরস্বৈত ঘালে বন্যার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ঘোলা পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসছিল এবং যাওয়ার সময় ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠেছিল। এখন যেন কোনো পৃথিবী নেই। আর কী বাকি আছে? মনে হচ্ছে আমি মরে গেছি।’

রয়টার্সকে তিনি জানান, তাদের আশপাশের পাহাড়ের ঢালগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি দেখে তার মনে হয়েছিল, এই দুর্যোগ থেকে হয়ত আর বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না।

ঘালে বলেন, তিনি দ্রুত কোনোভাবে একটি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে নিজের চোখের সামনে কাদাপানির স্রোতে চারপাশের সবকিছু ভেসে যেতে দেখেন। ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে।

একই গ্রামের ১৭ বছর বয়সি ঋষিকা কালওয়ার জানান, বন্যায় তাদের পৈত্রিক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ভাষায়, ‘যে জায়গায় আমরা জন্মেছি এবং দীর্ঘদিন বসবাস করেছি। আমাদের বাবা-মা অনেক যুদ্ধ করে অনেক সংগ্রাম করেছেন। আমার মনে হয় আমি এই সংগ্রামগুলো কখনো ভুলতে পারব না।’

নেপালে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। উদ্ধার তৎপরতায় ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ৪০টি হেলিকপ্টার। তবে কাদায় পুরোপুরি ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোতে জীবিতদের সন্ধান করাই এখন উদ্ধারকারীদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮৭ জন বিদেশি নাগরিক।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হেলিকপ্টার। কিন্তু কিছু অঞ্চল এতটাই পানিতে তলিয়ে গেছে যে সেগুলো কার্যত জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

নেপাল সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ২,৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের উদ্ধারে নেপালসহ বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে পৌঁছেছে। সেখানে এখনো ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই আকস্মিক বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

সূত্র: বিবিসি

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে