শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৯:৫১

মাত্র কয়েক দিনেই ১৩০ কিমি এলাকা হুতিদের দখলে, এগোচ্ছে ঝড়ের গতিতে

মাত্র কয়েক দিনেই ১৩০ কিমি এলাকা হুতিদের দখলে, এগোচ্ছে ঝড়ের গতিতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় তিহামাহ অঞ্চলে হুতিদের ঝড়ের বেগে অগ্রযাত্রা অনেক পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। দেশটির শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বড় ধরনের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি।

কয়েকদিন আগেও ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের উল্লেখযোগ্য অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল হুতিবিরোধী সৌদি সমর্থিত জোট ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের হাতে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় অংশ হুতিদের দখলে চলে গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইয়েমেনের উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে তারা।

গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি হুতিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ভয়াবহ বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের হামলার পরও হুতিরা যে এখনও শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে, এই অগ্রযাত্রা তারই প্রমাণ।

প্রতিপক্ষকে হতবিহ্বল ও মনোবলহীন করে দেওয়ার পর অদূর ভবিষ্যতে হুতিদের এসব এলাকা থেকে সরানো কঠিন হতে পারে।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, ‘এখন তারা সেখানে পৌঁছে গেছে। ফলে তারা সেখানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে। তাদের সেখান থেকে সরাতে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে।’

তবে হুতিরা একা নয়। তাদের পেছনে রয়েছে ইরানের সমর্থন। তেহরানের প্রতিরোধ অক্ষের অন্য অংশ যেমন, লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ার আসাদ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের ধাক্কা ও পরাজয়ের মুখে পড়ায় হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আল-ওমেইসি বলেন, এজন্যই ইরান তাদের সমর্থন হুতিদের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। আর হুতিদেরও অবশ্যই সেই সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে।

হুতিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে বর্ণনা করা ভুল; এ বিষয়ে অধিকাংশ বিশ্লেষক একমত। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বড় ধরনের যৌথ হামলা শুরুর সাত মাস পর তেহরান এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর সরাসরি কিংবা মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে রয়েছে। এর একটি পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি, অন্যটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং প্রক্সিদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশের বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তার মতে, এটি পারমাণবিক বোমার মতোই বড় ধরনের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা।

লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ, বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের সবচেয়ে সরু অংশের মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপও যদি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে তাদের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে।

ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের পর হুতিদের কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করেছে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট হামলাকারী নৌযানের কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, ভূখণ্ড দখল না করেও তারা বাব আল-মান্দেব দিয়ে যাতায়াতকারী এবং সুয়েজের দিকে যাওয়া জাহাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দেবের ঠিক পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে তাদের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে।

শুক্রবার বিকেলে হুতিদের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া সব কোম্পানির জন্য সামুদ্রিক নৌচলাচল নিরাপদ। তবে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ে থাকতে পারে।

এর আগে হুতিরা দাবি করেছিল, তারা শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। বাস্তবে এমন জাহাজেও হামলা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে নরওয়ের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে আইওনা ক্রেগ মনে করেন, এবার হুতিরা নির্বিচারে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ, তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিমান ও নৌ হামলার পুনরাবৃত্তি চায় না।

তিনি বলেন, তারা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির স্বাদ পেয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ নতুন করে এই সংঘাতে জড়াতে চাইবে কি না।

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলমান যুদ্ধ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে তেলের দাম আবার বাড়তে থাকায় ইয়েমেনে নতুন একটি ফ্রন্ট খোলা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিংবা নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে কতটা বাড়াবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে মার্কিন হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও ওয়াশিংটন তাতে সাড়া দেয়নি।

অ্যাক্সিওস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সংঘাত বাড়তে থাকায় ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। তারা একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে যেতে চাইছে।

তবে সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দেবের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে নয়। স্যাটেলাইট চিত্রে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আলামত দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য এই পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে হামলাটি ইরানের ইয়েমেনি মিত্রদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে তৈরি অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

হামলার নির্দেশ ইরান সরাসরি না দিলেও এর সুফল তেহরানের ঘরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারায়া শাইবান বলেন, সাম্প্রতিক লড়াইয়ের তীব্রতা যা ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে ভয়াবহ জুলাইয়ে শুরু হওয়ার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ওই সময় হুতিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ইয়েমেনে ফিরে আসে।

তিনি বলেন, এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। খুব স্পষ্টভাবেই মনে হচ্ছিল, ইরান এখন লোহিত সাগরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইয়েমেন যখন আবার সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক রক্ষা কবচ রক্ষায় উদ্বিগ্ন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে তখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নতুন ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক মাত্রা পেল।

আর ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, বোমাবর্ষণের শিকার, ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত ইয়েমেনের মানুষের জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র : বিবিসি

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে