বিনোদন ডেস্ক : একসময় যার কণ্ঠ-সুরে মুগ্ধ হতেন দেশের মানুষ, যার গান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে; জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া চরম অসহায়। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ভাঙা হাত নিয়েই শয্যাশায়ী দিন কাটছে তার। চিকিৎসার পাশাপাশি নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি বাথরুমে পড়ে গিয়ে তার ডান হাত ভেঙে গেছে। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি তিনি। প্রতিবেশীদের সহায়তায় স্থানীয় এক কবিরাজ ভাঙা হাতে ‘জাব’ বেঁধে দিয়েছেন। সেই ভাঙা হাত নিয়েই রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে সরকারিভাবে পাওয়া নিজের ছোট্ট ঘরে বিনাচিকিৎসায় পড়ে আছেন দেশের এই গুণী শিল্পী।
কাঙালিনী সুফিয়ার মেয়ে পুষ্প জানান, তিনি কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় ছিলেন। সেই সময় রাতের বেলায় বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে যান তার মা।
অসুস্থ কাঙালিনী সুফিয়া বলেন, “টাকা না থাকায় ডাক্তার দেখাতে পারছি না। কবিরাজ দিয়ে হাতের চিকিৎসা চলছে। আগে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে সংসার চলত। এখন বয়সের ভার আর অসুস্থতার কারণে গান গাইতে পারি না। আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দুবেলা ঠিকমতো খেতেও পারি না। প্রতিবেশীরা খোঁজখবর নেয় বলেই কোনোভাবে বেঁচে আছি।”
অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করে কাঙালিনী সুফিয়ার কন্যা পুষ্প বলেন, “আমি ঢাকায় থাকার সময় মা বাথরুমে পড়ে হাত ভেঙে ফেলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। টাকার অভাবে ভালো কোনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। এর মধ্যে আবার প্রায় চার হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল এসেছে। শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে মাকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাই। সেখান থেকে চিকিৎসা ও বিদ্যুৎ বিলের জন্য ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য টাকা দিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না। মা হার্ট, কিডনি-সহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন। সবার সহযোগিতা পেলে অন্তত তার চিকিৎসাটা ঠিকভাবে করাতে পারতাম।”
বর্তমানে প্রতিবেশীদের দেওয়া সহায়তায় কোনোভাবে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে বলেও জানান পুষ্প।
কাঙালিনী সুফিয়ার প্রকৃত নাম টুনি হালদার। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে এক সংগীতপ্রেমী পরিবারে তার জন্ম। মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রাম্য এক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে তার সংগীতজীবনের সূচনা।
১৯৭৮ সালে ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণের পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম রাখা হয় সুফিয়া খাতুন। একসময় ঢাকার হাইকোর্ট মাজার এলাকায় পথগায়িকা হিসেবে গান গাইতেন। সেখানে তার গান শুনে মুগ্ধ হন বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক ও কবি ফজল-এ-খোদা। তার উদ্যোগেই বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান সুফিয়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার তার অসাধারণ গায়কিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘কাঙালিনী’ উপাধি দেন। এরপর থেকেই তিনি সারা দেশে ‘কাঙালিনী সুফিয়া’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে প্রায় ৫০০টি গান রচনা করেছেন এই লোকসংগীতশিল্পী। বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লোকসংগীত পরিবেশন করে দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন তিনি।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন প্রায় ৩০টি জাতীয় সম্মাননা। অথচ জীবনের এই শেষ সময়ে সেই শিল্পীকেই চিকিৎসার জন্য মানুষের সহানুভূতি ও সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।