বিনোদন ডেস্ক : অনুরাগ কাশ্যপ তার ছবি ‘গ্যাংগস অফ ওয়াসিপুর’ ছবিতে ডার্ক হিউমারকে সম্ভব করে তুলতে একটা অনবদ্য উপকরণ ব্যবহার করেছিলেন। সেটা এই— ভারতীয় জনজীবনে বলিউডি হিন্দি ছবির সম্পৃক্ত অবস্থান।
চরম দুঃখের সময়েও ভারতীয়রা হিন্দি মেনস্ট্রিম মুভির কাটিংয়েই তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে, এই পরম নিষ্ঠুর সত্যটিকে অনুরাগ অতি ষত্নে তুলে ধরেছিলেন ‘গ্যাংগস অফ ওয়াসিপুর’-এ। ‘গ্যাংগস অফ ওয়াসিপুর’ ছিল ধানবাদ অঞ্চলের পটভূমিকায়। কিন্তু হিন্দি বলয়ের বাইরে এই বিষয়টা কতটা সত্য? বাঙালি-জীবনেও কি বলিউড কোনও জিন-মানচিত্রব্যাপী প্রভাব রাখতে পেরেছে?
১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত বাঙালির ফিল্মি-যাপন সীমায়িত ছিল টলিউডেই। হিন্দি ছবির অনুকরণ বা অনুসরণ ‘বাবু’-বাংলায় তেমন আমল তো পেতই না, উল্টে সামাজিক জ্যাঠামহাশয়রা ‘লোফার’ হিসেবে দেগে দিতেন। উত্তম-সুচিত্রার প্রভাবকে বাঁকা চোখে দেখলেও জ্যাঠামশায়বর্গের তাতে তেমন আপত্তি ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু শাম্মি কাপুর-‘দিল দে কে দেখো’-‘ইয়া ইয়া ইপ্পি ইপ্পি’ একেবারেই অ্যাকসেপ্টেড হত না। মেয়েরাও সালোয়ার-দুহিতা আশা পারেখ, নিম্মি-কে আত্তিকরণ করার সুযোগ সেই শাড়ি-ধারিণী যুগে তেমন পাননি।
১৯৭০-এর দশকই কি ছিল কবি বর্ণিত ‘কোন ভাঙনের কাল’? অমিতাভ-জমানা বাঙালিকে আমূল বদলে দেয়। কানচাপ্পি চুলে, ফ্যাঁতফ্যাঁতে বেলবটমে, ঠোঁটের কোণায় সিগারেট ঝুলিয়ে অ্যাডামস অ্যাপেলে ঢেউ খেলিয়ে মন্দ্রস্বর বের করে চোখ লক্ষ্ণীট্যারা করে বাহালি জ্যাঠা-কালচারকে পাট পাট করে দেয়। সত্তরের দশক যে মুক্তির দশক, সেটা হাড়ে হাড়ে মালুম পায় পশ্চিমবঙ্গ। মেয়েরা রেখাকে অ্যাডোর করলেও ‘নকল’ করতে পারেনি। কারণ রেখার মধ্যে আর যাই থাকুক, ‘বাঙালিত্ব’-র লেশ মাত্র ছিল না।
৭০ দশকে ফিল্মি বাঙালির একটা উল্টো পিঠও ছিল। সেটা প্যারালাল মুভি থেকে আগত। বচ্চন-কাটিংয়ের বাইরে ‘ভদ্র ছেলে’ তকমাকে বিনষ্ট না-করেও ফিল্মি হওনের রাস্তা খোলা রাখেন অমল পালেকর। ‘বয় নেক্সট ডোর’-কে তার রোম্যান্টিকতা আর হিউমার সমেত গ্রহণ করেছিলেন সেই সময়ের মিডল অফ দ্য রোড-এ বিশ্বাসীরা। মেয়েদের কাছেও জারিনা ওয়াহাব, বিন্দিয়া গোস্বামী হতে বাধা ছিল না।
১৯৮০-র দশকে মিঠুনায়ন ফ্লাড করে দেয় বঙ্গসমাজ। বচ্চন-পর্বে রাখা লম্বা জুলপি ফুসমন্তরে ধাঁ হয়ে যায়। প্যান্টের ঘের কমে আসে। ‘ডিস্কো ডান্সার’-এর পরে কোমর লচকে হাঁটা, ফ্যাঁসফেসে গলায় অস্ফূট শব্দোচ্চারণ, চোখকে অস্বাভাবিক লেভেলে ঢুলুঢুলু করে ফেলা ইত্যাদি র্যান্ডম অনুসৃত হতে থাকে। মেয়েরা স্কার্ট পরে কিছুটা নিতু সিংহ হয়ে ওঠেন। কন্তু তার বেশি কিছু নয়। কারণ, জ্যাঠামশায়রা তখনও ফতোয়াবাজি করে চলেছেন।
বিশ্বায়ন পর্বে, মানে ১৯৯০-এর দশকে জ্যাঠামশায় প্রজন্মে যারা উপনীত হন, তারাই ’৭০ দশকের বচ্চনীভবনে লিড রোলে ছিলেন। ফলে একটা উদার প্রশ্রয়ে বাজার ছেয়ে যায় আমিরী, সালমনি, শাহরুখি কেতায়। মেয়েরাও ঝক্কাস বিকেন্দ্রীভূত হয়ে যান রাতারিতি। কে যে কোন কাটিংয়ের ফিল্মি, মেয়েদের দেখে নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বায়ন যে আসছে আর এদেশে বলিউড তার ভগীরথ, সেটা হাড়ে হাড়ে মালুম পাওয়া গিয়েছিল। সেলুনওয়ালারা ব্যাপক ফাঁপরে পড়েন। বচ্চন বা মিঠুন-যুগে একটা হেয়ার কাটিং রপ্ত রাখলেই চলে যেত। এখন থেকে সে গুড়ে বালি।
তার পরে? তার আর পর নেই। বরুণ ধাওয়ান, রণবীর সিংহ, শাহিদ কাপুর-প্রিয়ঙ্কা, ক্যাটরিনা, দীপিকা— সব মিলেজুলে একটা প্রভাব তৈরি হয় বটে, তবে সে নেহাতই স্কিন-ডিপ। ম্যানারিজমহীন অভিনেতাদের অওকাদে কুলোয়নি সমাজের উপরে ‘প্রভাব’ তৈরি করা। সাড়ে বত্রিশ ভাজা-র কেতায় ঘুলিয়ে যায় রিয়্যালিটি। ফিল্ম আসে ফিল্ম যায় বাঙালির গঙ্গায় তেমন ঢেউ খেলে কি? এবেলা
২৫ মার্চ, ২০১৬/এমটিনিউজ২৪/এসপি/এমএন