সোমবার, ০৯ মার্চ, ২০২৬, ০৯:৫৬:০৪

বাম্পার ফলন, ফরিদপুরে পেঁয়াজের দাম কত হলো জানেন?

বাম্পার ফলন, ফরিদপুরে পেঁয়াজের দাম কত হলো জানেন?

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ফরিদপুরে বর্তমানে চলছে বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মাঠে পেঁয়াজ ওঠানোর ধুম। খরচের তুলনায় পেঁয়াজের দাম কম থাকায় চাষিদের চোখে-মুখে মলিন হাসি। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের তফাৎ থাকায় হতাশ তারা। গত বছরের তুলনায় এ বছর পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। এ বছর ৯০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে কৃষি কাজে আগ্রহ কমছে চাষিদের।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ ধরা হয়। আবাদ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা এবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় যারা বুক বেঁধেছিলেন, রমজানের ঠিক আগে বাজারে দরপতনে তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৯৫০ থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।

উপজেলার বালিয়া বাজারের পেঁয়াজ হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা বেশি। নগদ টাকার জরুরি প্রয়োজন হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ মনে বাড়ি ফিরছেন।

সালথা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সালথায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের দাবি, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি ও সেচ খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ফলে বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক শফিকুল বলেন, কীটনাশক, সার ও ওষুধের দাম অনেক বেশি। প্রতি মণে ১৫০০ টাকা খরচ করে এখন এত কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বালিয়াগট্টি গ্রামের কৃষক জসিমউদ্দিন ৫ বিঘা জমিতে আবাদ করে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন। এতে দেশি উৎপাদন কমলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

মালেক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল খালেক জানান, তারা প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫-২৬ টাকায় কিনছেন, যেখানে অনেক সময় কেজিতে ১-২ টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, মণপ্রতি দাম ১৫০০-১৬০০ টাকা থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই লাভবান হতো।

সালথার নকুলহাটি, ঠেনঠনিয়া, কাগদি, মাঝারদিয়াসহ বিভিন্ন হাটে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এলেও দাম বাড়ছে না। কৃষকদের দাবি, ধান-গমের মতো পেঁয়াজেরও সরকারি সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা এবং প্রতিটি ইউনিয়নে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন সিকদার বলেন, বাজারে চাহিদা কম থাকায় দামও কম। অনেক কৃষক দেনা পরিশোধের চাপে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। তবে সম্ভব হলে কৃষকদের পেঁয়াজ কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। পরবর্তীতে চাহিদা বাড়লে তারা ভালো দাম পেতে পারেন।

এদিকে জেলার নগরকান্দা, সদর, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র। জেলায় সর্বত্রই এখন খেত থেকে চাষিরা পেঁয়াজ উত্তোলনে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার অধিকাংশ উপজেলা বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে তাকালেই এমন দৃশ্য চোখে মেলে। কেউ খেত থেকে পেঁয়াজ তুলছেন, কেউ বস্তায় ভরছেন, কেউবা মাঠ থেকে বস্তা মাথায় করে সড়কে তুলছেন। পেঁয়াজ চাষিরা কেউ ভ্যান বা নছিমনে বাজারে নিচ্ছেন বেচার উদ্দেশ্যে।

ফরিদপুরের বিভিন্ন পেঁয়াজ বাজারে পাইকারি পেঁয়াজের দর রয়েছে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত মণ। সেখানে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা চাষিরা বলছেন, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনের ব্যয় হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। 

বোয়ালমারী উপজেলার হাসামদিয়া গ্রামের কওসার মজুমদার ১০-১২ কৃষক নিয়ে পেঁয়াজ তুলছিলেন দাদুড়িয়া বিল মাঠে। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ভাই পেঁয়াজের দামের যে অবস্থা তাতে আমাদের সবদিক থেকে ঘাটতি। এ বছর এক পাখিতে (৩০ শতাংশ) ৩৫-৪০ মণের বেশি হবে না। তাতে প্রতি পাখিতে ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কৃষকের ঘাটতি পূরণ করতে হলে ২০০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা মণ পেঁয়াজ বিক্রি করা দরকার। সরকারের কাছে আমরা পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। এ কারণে কৃষি কাজে আগ্রহ কমে যাচ্ছে আমাদের।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এটা ঠিক যে, পেঁয়াজের দামে খুব একটা খুশি নন চাষিরা। কারণ বাজারে পেঁয়াজের জোগান বেড়েছে অনেক, সে তুলনায় ক্রেতাদের চাহিদা কম থাকায় দর পড়ে গেছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চাষাবাদ হয়েছে বেশি। আমার পরামর্শ- এ মুহূর্তে পেঁয়াজ বিক্রি না করে কয়েক মাস সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করলে কৃষকরা ভালো দর পাবেন।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে