সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:৩০:২৪

'মির্জা ফখরুল মানেই সাহস, হার না মানা এক যোদ্ধা'

'মির্জা ফখরুল মানেই সাহস, হার না মানা এক যোদ্ধা'

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক :  আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনই জীবনের শেষ নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে আগেই জানিয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এবার ভোটারদের প্রতি তার আকুল আবেদন— ‘শেষবেলার এই সন্ধিক্ষণে আমাকে আপনাদের হৃদয়ে ঠাঁই দিন।’

সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এ আবেদন জানান ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই প্রার্থী। ওই পোস্টে নিজের একটি ডকুমেন্টারি ভিডিও সংযুক্ত করেছেন তিনি।

স্ট্যাটাসে মির্জা ফখরুল লিখেন, দীর্ঘ সংগ্রামের রাজপথে আপনাদের প্রতিটি হাসি আর সমর্থনই আমাকে আজকের এই আলমগীর হিসেবে গড়ে তুলেছে। জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে আমি কোনো বিষাদ নয়, বরং এক নতুন ভোরে গণতন্ত্রের সূর্য দেখার প্রত্যয় নিয়ে আপনাদের দুয়ারে এসেছি। 

এরপর তিনি লিখেন, হয়তো ভোটের জন্য এটাই আমার শেষ আহ্বান, তবে এই আহ্বান এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের। আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমি ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিকে বিশ্বদরবারে গৌরবান্বিত করতে চাই। শেষবেলার এই সন্ধিক্ষণে আমাকে আপনাদের হৃদয়ে ঠাঁই দিন। 

বিএনপি মহাসচিব আরও লিখেন, আমি আপনাদেরই মানুষ, আপনাদের মাঝেই থাকতে চাই। আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন—আপনাদের এই আস্থার মর্যাদা আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও রক্ষা করব। এবারও কথা দিচ্ছি, আপনাদের জয় হবেই।

এদিকে পোস্টে সংযুক্ত ভিডিওতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন তুলে ধরা হয়। 

ভিডিওর শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার একাংশ পাঠ করেন বিএনপি মহাসচিব। 

এরপর ভিডিওতে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এক নারীকে বলতে শোনা যায়, আলমগীর স্যার ভালো লোক। বিপদে-আপদে ডাকলে আমরা তাকে পাশে পাই। 

আরেক তরুণ বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মানেই সাহস। হার না মানা এক যোদ্ধা। আরেক বৃদ্ধা বলেন, আলমগীর আমার ছেলের মতো।

মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম বলেন, সবকিছু আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে। তার যোগ্যতাই তাকে এ জায়গায় নিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, আমার পরিবার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়িতে এসেই আমি এই রাজনৈতিক পরিবারের সংস্পর্শে এসেছি। 

মির্জা ফখরুল বলেন, আমার পরিবারের মধ্যেই রাজনীতি ছিলো। আমার বাবা পলিটিক্স করতেই। এই পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে পার্লামেন্ট মেম্বার ছিলেন।

তার বড় মেয়ে মির্জা সামারুহ বলেন, আব্বু হচ্ছে আমার সারাজীবন জুড়ে থাকা এমন একজন মানুষ, যাকে নিয়ে আমার অভিমান হয়েছে, রাগ হয়েছে, মন খারাপ হয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি হয়েছে শ্রদ্ধা। আব্বু মহাসচিব হওয়ার পরেই কিন্তু পুরো সংগ্রামটা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো— জেল-জুলুম, পুরো একটা রাজনৈতিক দলকে এক করে রাখা, তাদেরকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, স্ট্র্যাটিজিক্যালি বলুন, যেভাবেই বলুন।  

তিনি বলেন, আমার আব্বা আসলে বাইরে যেমন, ভেতরেও তেমন। নিজের আদর্শ ও মূল্যবোধের বিষয়ে ভীষণ একরোখা একজন মানুষ। কিন্তু সম্ভব একটা নরম মন আছে তার।  

প্রফেসর মনতোষ কুমার দে বলেন, আলমগীর একটা বাদশা। বাদশার মতো হৃদয় তার। আমরা তাকে মির্জা আলমগীর বলি। ঢাকায় সবাই তাকে ডাকেন মির্জা ফখরুল। আমরা আলমগীর বলি। 

তিনি আরও বলেন, ভিন্ন দলের, ভিন্ন মতের যারা, তাদের সঙ্গেও মেলামেশা করতো সে। মানুষের প্রতি ভালোবাসাটাই তাকে রাজনীতির দিকে নিয়ে গেছে।  

ভিডিওতে আরেকজন বলেন, তাকে (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) নিয়ে আমরা গৌরব করি, পুরো ঠাকুরগাঁওবাসী গৌরব করে। 

ভিডিওর পরের অংশে নিজের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের গল্পও তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে তিনি বলেন, যখন ২৬ মার্চ রাতে রেডিওতে অফিসার জিয়ার গলা শোনা গেল, তখন বুঝলাম, আমরা যুদ্ধ করছি, আমরা রিভল্ট করছি। 

মির্জা ফখরুল বলেন, যখন দেশ স্বাধীন হলো, পাকিস্তান আর্মি সারান্ডার করলো, তখন আমাদের মনে হলো যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যে সমাজতন্ত্রের ঘোষণা দিয়েছে, এরপরে আর কিছু দরকার হবে না। আমার যেহেতু শিক্ষকতাতে ঝোঁক ছিল, তখন আমি শিক্ষকতাতে যোগ দিই। কিন্তু, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতা, তা ছিল আমাদের জন্য খুব কষ্টের। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রক্ষী বাহিনীকে দিয়ে অনেককেই হত্যা করা হয়েছিল। 

তিনি বলেন, পরবর্তীকালে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়োগান্তক পরিণতি হয়, জিয়াউর রহমান যখন সামনে আসলেন, আমি যেটা দেখলাম— জিয়াউর রহমানের মধ্যে প্রচুর আন্তরিকতা রয়েছে, সততা রয়েছে। দ্য বেস্ট পিপল, যারা আশেপাশে ছিল, তাদেরকে তিনি তুলে আনতে শুরু করলেন। সবশেষে যেটা হলো তিনি তো বাঁচলেন না। তাকে মেরে ফেলা হলো।... এখান থেকে বেশ চাপ শুরু হলো যে, আমাকে লোকাল পলিটিক্সে আসতে হবে। 

মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম বলেন, সেই সুবাদেই তিনি (মির্জা ফখরুল) প্রথম রাজনীতিতে এলেন মেয়র হিসেবে। এবং খুব সফল মেয়র ছিলেন তিনি ওই সময়। 

মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৮১ সালে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির দায়িত্বে আসেন। এরপর বেগম জিয়ার যে ভূমিকা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথে তার যে আন্দোলন, তা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। পরে যখন ১৯৯১ সালে নির্বাচন এলো, তখন তিনি আমাকে ডেকে নির্বাচন করতে বললেন। এভাবেই বিএনপিতে আমার যাত্রা শুরু।  

বিএনপির রাজনীতিতে আসার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি যে রাজনীতিটা করেছে; বিশেষ করে অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বিএনপির পলিসি অনেক ভালো ছিল।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বাংলাদেশি, কারও প্রভুত্ব মেনে না নেওয়া— এই বিষয়গুলোর জন্যই আমি মনে করি বিএনপিতে তরুণদের আসা উচিত; বিএনপিকে আরও সমৃদ্ধ করা উচিত। 

রাজনীতির জন্য পারিবারিক ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, খুব অন্যায় করেছি আমি পরিবারের প্রতি। পরিবারকে সময় দিইনি। আমার মেয়ের এটা নিয়ে অনেক বড় একটা দুঃখ আছে। আমার বড় মেয়ে তো অনেক জায়গায় এটা বলেও ফেলে। ওর মা ওদেরকে ওদেরকে খুব কষ্ট করে বড় করেছে। আমি যে পলিটিক্স করতে পারি এটাও তার জন্যে। তিনি চাকরিও করেছেন। আমি তো চাকরি ছেড়ে রাজনীতি করেছি।  

প্রফেসর মনতোষ কুমার দে জানান, তার (মির্জা ফখরুল) বাবার যে সম্পত্তি, তার নিজের যে সম্পত্তি, তার বাড়ির সামনে যে সমস্ত জায়গাগুলো— রাজনীতি করতে গিয়ে মির্জা আলমগীর সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন।

রাহাত আরা বেগম জানান, সম্পদের প্রতি কোনোদিন তার স্বামীর কোনও আকর্ষণ ছিল না। 

মেয়ে মির্জা সামারুহ বলেন, পুরো পরিবারেই একেকজন একেকটা পার্ট প্লে করেছে। কিন্তু, আমার মনে হয়, আমাদের ত্যাগগুলো খুবই ক্ষুদ্র। এর চেয়ে অনেক বড় বর ত্যাগ আমার বাবা নিজে করেছেন, বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবার করেছে। 

ভিডিও শেষাংশে মির্জা ফখরুল বলেন, অনেকের মধ্যেই কিন্তু একটা প্রবণতা আছে যে, একাত্তরকে ভুলে যান; একাত্তরে তো আমরা ছিলাম না। ওসব ভুলে যান, চব্বিশ নিয়ে কথা বলেন। আরে, একাত্তর ভুলবো কী করে? একাত্তর তো আমার জন্ম। আমার অস্তিত্ব। আমার পরিচয়য়। 

বিএনপি মহাসচিব বলেন, চব্বিশের সাথে তো আমার বিরোধ নাই। চব্বিশে তো আমার অধিকারের প্রশ্নে লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণাকারীর দল। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। একদিকে স্বাধীনতা, আরেকদিকে গণতন্ত্র— সবকিছু মিলে বিএনপিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফোরাম, সঠিক ফোরাম দেশপ্রেমিক তরুণদের জন্য। 

ভিডিওর শেষে ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা দিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ধর্ম মানুষের নিজস্ব ব্যাপার। প্রত্যেকের নিজের ধর্ম থাকবে। আমি এখন এটাকে রাজনীতিতে নিয়ে এসে বিভক্তি সৃষ্টি করবো, ধর্মের জন্য ঘৃণা ছড়াবো— এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। 

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে