বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:৫৭:১১

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কী পিছিয়ে যাচ্ছে?

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কী পিছিয়ে যাচ্ছে?

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না গিয়ে প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটছে সরকার। ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে সম্প্রতি প্রশাসক নিয়োগের ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

সরকারের এ পদক্ষেপের ফলে যথাসময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী দলগুলো। 

তাদের মতে, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির বদলে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আসন্ন নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা নিতে চাইছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তবে এমন সমালোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতেই এ অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তোড়জোড় এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জেলা-উপজেলার নাম, ইউনিয়ন ও পৌরসভার নাম, সর্বশেষ নির্বাচনের তারিখ, প্রথম পরিষদ সভার তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারীর পরিচয়, কোনো আইনি জটিলতা বা সীমানা বিরোধ সংক্রান্ত মামলা আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভা বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী কি না। মূলত এ তথ্যের ভিত্তিতেই জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

বিএনপি নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে। তবে তার আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়া এবং মাঠের উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করা হতে পারে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বিএনপি সরকারের একমাস পূর্ণ হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সরকারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ব্যস্ত। যথাসময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের পাশাপাশি জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হচ্ছিল। জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে সারা দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বর্তমান বিধিবিধান ও নিয়ম মেনে পর্যায়ক্রমে যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ব্যবস্থা করব। নিঃসন্দেহে এ নির্বাচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তবে তার আগে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, তা জাতীয় সংসদ থেকে চূড়ান্ত হতে হবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইউনিয়ন ও পৌরসভার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলেন দায়িত্বশীলদের। এরপরই সব ডিসির কাছে হালনাগাদ তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিনই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করার কথা বলেছিলেন। পরে সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করায় এ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়। তবে বাকি সিটি করপোরেশনগুলোয় এ বছরের মধ্যেই নির্বাচন হতে পারে।

এদিকে, প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিকে মোটেও ইতিবাচকভাবে দেখছে না বিরোধী দলগুলো। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর জনগণের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল শিগগির স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সরকার সেই পথে না হেঁটে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ৬টি এবং ১৪ মার্চ আরও ৫টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগ পাওয়া সবাই বিএনপির নেতাকর্মী এবং তাদের অনেকেই সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকার তড়িঘড়ি করে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ না দিয়ে নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে পারত। ১১টি সিটি করপোরেশনে সরকারের এ একপক্ষীয় নিয়োগ জনগণের মতামত ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন।

জামায়াতের এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মনে করেন, দেশে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই প্রশাসন পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু সরকার নিজেদের দলীয় সুবিধার্থে আগে থেকেই প্রশাসনে দলীয় লোকদের বসিয়ে রাখছে, যা মাঠে ভিন্ন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য একটি ঘৃণ্য অপচেষ্টা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম অভিযোগ করে বলেছেন, বিএনপির যেসব নেতাকর্মী হেরে গেছেন, তাদেরই জেলা পরিষদের প্রশাসক, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশাসক নিয়োগ থেকে বোঝা যায়—এটি বিএনপির স্বৈরাচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ।

তিনি বলেন, বিএনপি এতদিন ধরে গণতন্ত্রের অনেক বড় বড় লেকচার দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি মাত্র সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের সময় বিএনপি বলেছিল, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। এখন তারা নির্বাচিত সরকার হয়ে প্রতি জায়গাতে প্রশাসক দেওয়া শুরু করেছে। এই প্রশাসকদের দিয়ে তারা বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতা কুক্ষিগত করবে, সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দলীয় লোকদের দেবে। এটা তো স্বৈরাচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ। তারা যদি প্রশাসক বসিয়ে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে চায়, তাহলে আমরা তাদের বলব, এই বাংলাদেশে কোনো স্বৈরাচার স্থায়ী হতে পারেনি, আগামীতে কেউ চেষ্টা করলে সেটা করতে পারবে না।

নির্বাচনের সময়সীমা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালের ২১ জুন প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়। এগুলোর মেয়াদ আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই শেষ হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। পরে ২০২১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে হওয়া ইউনিয়নগুলোর মেয়াদও শেষ হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সেসব ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে যেসব ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছিল, সেগুলোও ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে।

মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য বলছে, চার হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়নের মধ্যে চার হাজার ৫৭১টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সীমানা ও মামলাজনিত জটিলতার কারণে বাকি সাতটিতে নির্বাচন হয়নি। এসব ইউনিয়নের কিছু জনপ্রতিনিধির মৃত্যু হলেও গত দেড় বছরে সেগুলোয় উপনির্বাচন হয়নি। এ ছাড়া বেশিরভাগ ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হওয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে অনেকে আত্মগোপনে। এটারও সঠিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। ডিসিদের পাঠানো তথ্য থেকে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় অবগত হতে পারবে।

এদিকে ২০২১ সালে ৩৩০টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলোতেও দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করতে চায় সরকার। কারণ জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করায় সেগুলোতে নাগরিক সেবা নানাভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে