এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মো. রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লু (৪০) নামে আরও দুই ব্যক্তিকে বিদেশি রিভলবার ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। একইসঙ্গে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্যও উন্মোচন করেছে তদন্তকারী দল।
র্যাব বলছে, যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা সরাসরি কিলিং মিশনে ছিল। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রিভালবার ও তিন রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তারা অবৈধ পথে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু, ব্যর্থ হয়ে বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহে চেষ্টা করছিল তারা।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাজধানীর মিরপুর র্যাব-৪ এর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির।
তিনি বলেন, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী এই দুই শ্যুটার ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিল। এক পর্যায়ে আমরা জানতে পারি, তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করছে। কিন্তু হাদি হত্যার পর সীমান্তে কড়াকড়ি শুরু হলে তারা অবৈধ পথে দেশ অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কিছুটা স্থিরতা এলে তারা ঢাকায় ফিরে আসে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভিসা এগুলো তৈরির কাজ শুরু করে।
শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুরের রূপনগর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাশেদ ওরফে লোপনকে এবং উত্তরা ১৮নং সেক্টরে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার লোপনের দেওয়া তথ্যমতে, তার বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি রিভলবার ও ৩ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করার কথা স্বীকার করেছে উল্লেখ করে র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, লোপনের কাছ থেকে পাওয়া রিভলবারের চেম্বারে ছয়টি গুলি থাকার কথা। কিন্তু পাওয়া গেছে তিনটি গুলি। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, ঘটনার সময় সে দুটি দুই রাউন্ড ফায়ার করেছিল গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করতে এবং এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করেছিল আশপাশের জনগণকে সরিয়ে দিতে।
গোলাম কিবরিয়া হত্যায় কিলিং মিশনে কতজন অংশ নিয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিলিং মিশনে সরাসরি শ্যুট করার জন্য ছিল তিনজন শুটার। একজন শুটার জনি, সে আগেই ধরা পড়েছে। আজকে আমরা আরও দুই শ্যুটারকে ধরেছি।
শাহাবুদ্দিন কবির আরও বলেন, তাদের অস্ত্র দেওয়া এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রেসকিউ টিমে ছিল ‘ভাগিনা মাসুম’। অস্ত্রগুলো সরবরাহ করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে ছিল ‘পাতা সোহেল’। আর নিহত কিবরিয়া গোলাম কিবরিয়াকে নজরদারি করার কাজে নিযুক্ত ছিল সুজন। সার্বিকভাবে দেখা যায়, এই কিলিং মিশনে ছয় থেকে সাতজন জড়িত ছিল।
হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আসামিদের স্বীকারোক্তি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আসামিদের কাছ থেকে আমরা যে ডিভাইসগুলো পেয়েছি, সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা দেখতে পাই যে আসামিদের মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। গোলাম কিবরিয়া পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব হিসেবে বেশ জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতও খুবই উজ্জ্বল ছিল। তিনি হয়তো পরবর্তীতে পল্লবী থানা বিএনপির বড় কোন পদে যেতে পারতেন।
মশি যে ঝুট ব্যবসা, হাউজিং ব্যবসা, ডেভলপার ব্যবসা, ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন, এগুলোতে কিবরিয়া বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে আমরা প্রাথমিক জানতে পেরেছি। এর কারণেই কিবরিয়াকে তারা সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী মিরপুর ১২ নম্বরের বি ব্লকে ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামের একটি দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে। ঘটনার পর দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন এবং দ্রুত না চালানোয় চালককে কোমরে গুলি করে আহত করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি হিসেবে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় আরও সাত-আটজন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময়ই জনি নামে এক শ্যুটারকে আটক করে পুলিশে দেয় জনগণ। পরদিন মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. মনির হোসেন ওরফে সোহেল ওরফে পাতা সোহেল এবং মো. সুজন ওরফে বুকপোড়া সুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।