এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে রাষ্ট্রপতি করার শর্তে রাজি হন শেখ হাসিনা। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড বৈধতা দেওয়ার বিষয়েও একমত পোষণ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকার সেফহোমে কারাবন্দি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকেও অংশ নেন মইন উ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিনজন সদস্য, একটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্তাব্যক্তি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে থাকা সাবেক দুই লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে এসব বিষয় জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র বলছেন, শুধু দুই বছর নয়, মাইনাস টু ফর্মুলার মাধ্যমে অন্তত টানা ১০ বছরের ক্ষমতায় থাকার টার্গেট ছিল ওয়ান-ইলেভেন কুশীলবদের। সে পথেই এগোচ্ছিলেন তাঁরা। তবে অতিমাত্রায় দমনপীড়ন, রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একের পর এক ঘটনায় দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যেতে থাকে কলকারখানা।
সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সেনাসদস্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় কুশীলবদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
লে. জেনারেল মামুন খালেদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের পুরোটা সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের পার্ট দেখভাল করতেন মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। বিএনপির অংশ দেখতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফজলুল বারী। শুরুর চার-পাঁচ মাস এভাবে চললেও একপর্যায়ে সবকিছুই সমন্বয় করতে শুরু করেন এ টি এম আমিন।
গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন বারী। শেখ হাসিনাও তাঁর কমিটমেন্ট থেকে সরে যান। তবে সেইফ এক্সিট দেন মইন উ আহমেদকে।’
সূত্র বলছেন, ওয়ান-ইলেভেন শুরুর কিছুদিন পরই এ টি এম আমিনের হয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেন মামুন খালেদ। বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
মামুনের হয়ে কাজ করতেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) আবজাল নাছের। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে নিজেকে আওয়ামী লীগ প্রমাণে উঠেপড়ে লাগেন আবজাল। বেগম খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়ার নেপথ্যেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
অন্যদিকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্য মামুন খালেদ তাঁর ওপর অর্পিত বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট সুচারুভাবে বাস্তবায়নও করেন। প্রতিদান হিসেবে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হন তিনি। বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ অনেক ঘটনায় নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করেন। যাবতীয় শর্ত চূড়ান্ত করার জন্য নির্বাচনের তিন মাস আগে সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ জেল থেকে শেখ হাসিনাকে বের করে নেওয়া হয় সন্ধ্যা ৭টার দিকে। টানা আড়াই ঘণ্টা বৈঠক এ টি এম আমিন পরিচালনা করলেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন মামুন খালেদ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে শেখ হাসিনাকে পুনরায় রেখে আসা হয় সাবজেলে।
সূত্র আরও বলছেন, ওয়ান-ইলেভেনে মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন মেজর সুলতানুজ্জামান সালেহ। শুরুতে তাঁকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে (ডিজিএফআই) অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। ‘জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তিনি সারা দেশে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কদের সঙ্গে অপারেশন সমন্বয় করতেন। অনেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করতেন তিনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনি ডিজিএফআইতে সিটিআইবির কর্নেল ‘জিএস’ হিসেবে পদোন্নতি পান। সবশেষ মেজর জেনারেল হয়ে অবসরে যান। ইভিএম কেলেঙ্কারিসহ নানান গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে সালেহর বিরুদ্ধে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্মকমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলাসা হয়নি। এজন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে মামুন খালেদকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আবজাল নাছের দেশের অনেক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সাক্ষী ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।’
ফের রিমান্ডে মামুন খালেদ : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজধানীর মিরপুর থানার দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল এ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. জুয়েল রানা ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন