সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৮:৪৯

দেবে যাচ্ছে বরিশাল!

দেবে যাচ্ছে বরিশাল!

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের দক্ষিণ জনপদের প্রধান শহর বরিশাল। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শহরটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় পৌনে ২ মিলিমিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এই দেবে যাওয়ার পরিমাণ এক ইঞ্চি পর্যন্তও পৌঁছাচ্ছে। মাটি দেবে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা দেখা দিচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, যা এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি বরিশাল শহরের বৌদ্ধপাড়া, বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন হেলে পড়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। যদিও এসব পরিবর্তন খালি চোখে অনেক সময় বোঝা যায় না, তবে স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে।

২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ও জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স যৌথভাবে বরিশালে ছয় বছরব্যাপী গবেষণা চালায়। সেই গবেষণাতেই উঠে আসে এই উদ্বেগজনক চিত্র।

বিশ্লেষকদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রণহীন ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। এর প্রভাব শুধু শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, পাশের অন্তত ১০টি ইউনিয়নেও ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষিখাতও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) বরিশাল মহানগরী ও সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে জরিপ চালায়। সেই জরিপে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে মহানগরীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় প্রায় ৪৫ ফুট নিচে। অন্যদিকে সদর উপজেলার জাগুয়া, কড়াপুর, কাশিপুর, চরবাড়িয়া ও চরকাউয়া ইউনিয়নে পানির স্তর নেমে যায় প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত। ফলে এসব এলাকার মানুষকে পানির চাহিদা মেটাতে সাবমারসিবল মোটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, কৃষিকাজের জন্য ভূ-অভ্যন্তরীণ পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বর্ষাকালে সাধারণত ৫-৭ ফুট নিচে গেলেই পানির স্তর পাওয়া যায়। তবে গ্রীষ্মকালে পানির সংকট তীব্র হয়, ফলে কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ে। বর্তমানে সেচের একটি বড় অংশ নদী ও জলাশয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সমন্বয়কারী রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বরিশালের পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, মহানগরীতে বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি নলকূপ রয়েছে। এসব নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির তিনটি স্তরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর স্তর থেকেও পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, আর সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে উপরের মাটি ধীরে ধীরে দেবে যাচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি নূরুল হাসান স্বাক্ষর বলেন, একসময় বরিশালে অসংখ্য খাল ও জলাশয় ছিল। সেগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান তরফদার জানান, আগে ৭০০-৮০০ ফুট গভীর নলকূপেই নিরাপদ পানীয় জল পাওয়া যেত। কিন্তু এখন স্থানভেদে ১০০০ থেকে ১১০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসাতে হচ্ছে।

অন্যদিকে নগর প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট স্থাপন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার শর্ত কঠোর করা এবং মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে বরিশালকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটি দেবে যাওয়ার গড় হার আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বরিশাল শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।-সময় নিউজ

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে