এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ডিমের উচ্চ চাহিদা ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে ডিমের দাম বেড়েছে। আর এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন সারা দেশে সবজির দামও চড়া। লেয়ার মুরগির খামারি ও ব্যবসায়ীরা এমন মন্তব্য করেছেন।
নোয়াখালী অঞ্চলের লেয়ার খামারিরা জানিয়েছেন, রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে অন্তত ২০ শতাংশ খামার বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি টানা কয়েক মাস ধরে ডিমের কম দামের কারণে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা খামারিদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যখন ডিমের চাহিদা বেড়েছে, তখন অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ায় ডিমের দামও বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, হাজার হাজার উৎপাদকের এই প্রতিযোগিতামূলক ডিমের বাজারে কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই।
লেয়ার খামারের জন্য পরিচিত নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার খামারি, পাইকার ও আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিমের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি লেয়ার খামারিদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও তারা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘ ৭-৮ মাস ধরে কম দামে ডিম বিক্রি করে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। খামারিদের দাবি, এই সময়ে বাদামি বর্ণের প্রতি ডিম উৎপাদনে প্রায় ৯ টাকা ৫০ পয়সা খরচ হলেও তারা প্রতিটি ডিম প্রায় ২ টাকা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব নূরপুর এলাকার খামারি মো. মুনির উদ্দিন (৪৬) জানান, ‘বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে মুরগিতে মড়কের আতঙ্ক এবং টানা পাঁচ মাস বড় ধরনের লোকসানের কারণে এক শেডের দুই হাজার ডিমপাড়া মুরগি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
এতে প্রায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের কাছে ডিমের চাহিদা বেড়েছে এবং দামও আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হওয়ায় সাড়ে ৭০০ টাকা দরে ডিমপাড়া মুরগি কিনে আবার খামার শুরু করেছি।’
তার মতে, দীর্ঘ ৭-৮ মাস উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রতি ডিমে গড়ে ২ টাকার বেশি লোকসান গুনে অনেক প্রান্তিক খামারি ডিলারদের কাছে দেনাগ্রস্ত হয়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যখন ডিমের খামারগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে ছিল, তখন ডিম বিক্রির জন্য আমরা ব্যবসায়ীদের খুঁজতাম। আর এখন আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ খামারে মুরগি নেই, আশানুরূপ উৎপাদনও নেই।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা বারবার ফোন করে ডিম চাইছেন। বেশি দাম দিয়েও ডিম কিনতে চাইছেন। সে কারণেই গত কয়েক দিনে ডিমের দাম কিছুটা বেড়েছে। এই দাম খামার পর্যায়ে কমপক্ষে ১২-১৩ টাকা না হলে অদূর ভবিষ্যতে অধিকাংশ লেয়ার খামার বন্ধ হয়ে যাবে এবং ডিমের সংকট আরো প্রকট হবে। তখন আবার বিদেশ থেকে ডিম আমদানি করতে হতে পারে।’
নূরপুর এলাকার খামারি নূরুল করিম সোহাগের (৪১) পৃথক দুটি শেডে ২ হাজার ১০০ মুরগির খামারে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একদিকে বাজারে মাছ ও তরকারির সরবরাহ কম থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ডিমের চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে ডিলারদের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রান্তিক খামারিদের দায়-দেনা বেড়ে যাওয়ায় অনেকে ফিড ও ওষুধ না পেয়ে উৎপাদনশীল মুরগি বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ডিমের স্বাভাবিক উৎপাদনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দুই কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম দিয়েও ডিম চাইছেন, অগ্রিম বুকিং দিচ্ছেন; কিন্তু আমরা চাহিদামতো ডিম সরবরাহ করতে পারছি না।’ তার মতে, ‘কোম্পানিগুলো যদি মুরগি ও ডিমের ব্যবসায় না থাকত, তাহলে বাজারে সব সময় ডিমের সংকট থাকত এবং আমরা প্রান্তিক খামারিরা সারা বছর ১৪-১৫ টাকা দরে ডিম বিক্রি করতে পারতাম। কোম্পানিগুলোর কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় বাজারে ডিম ও মুরগির সরবরাহ বেশি থাকায় ক্ষুদ্র খামারিরা প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না।’
জেলার কবিরহাট উপজেলার বড় রামদেবপুর এলাকার সাত হাজার লেয়ার মুরগির খামারি মেজবাহ উদ্দিন সুজন বলেন, ‘২০০৩ সালে ব্রয়লার খামার করে অব্যাহত লোকসান এড়াতে ২০১৬ সালে লেয়ার খামার শুরু করি এবং লাভের মুখও দেখি। কিন্তু গত ১০ মাসের মধ্যে ৯ মাসই কল্পনাতীত লোকসান গুনতে হয়েছে। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা খরচ হলেও গড়ে ৭ টাকা ৩০ পয়সা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। যে খামারির মুরগি যত বেশি, তার লোকসানও তত বেশি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর সঙ্গে ভাইরাসজনিত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় অন্তত ৩০ শতাংশ মুরগি মারা গেছে। ফলে ডিমের উৎপাদনও একই হারে কমেছে। গত কয়েক দিন ধরে বাজারে ডিমের চাহিদা বাড়ায় দামও কিছুটা বেড়েছে। ৭ মে খামার থেকে বাদামি বর্ণের প্রতি ডিম ১০ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করেছি।’
নিজের তিনটি লেয়ার খামার পরিচালনাকারী পার্শ্ববর্তী খামারি আবদুল শাহেদ (২৯) বলেন, “লেয়ার ব্যবসায় বছরের ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই লোকসান গুনতে হয়। বাকি তিন মাস লাভ হলেও তা দিয়ে আগের নয় মাসের ক্ষতি পোষানো যায় না। এর পরও উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে যখনই আমরা ভালো দাম পাই, তখনই একটি মহল ‘সিন্ডিকেট বাণিজ্য’সহ নানা অপপ্রচার শুরু করে। অথচ আমাদের কঠিন লোকসানের সময়ে কেউ কথা বলে না, খোঁজও নেয় না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় ব্যবসার খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী ডিমের দাম বাড়েনি।”
জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কলমী এলাকার খামারি ফরহাদ হোসেন জাহান (৩৪) জানান, ৭ বছর আগে ১ হাজার ৮০০ মুরগি দিয়ে খামার শুরু করলেও বর্তমানে তার ৮টি পৃথক শেডে ১৮ হাজার লেয়ার মুরগি রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার মুরগি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭ হাজার ৮০০ ডিম উৎপাদন হয়।
তার মতে, ‘শুরু থেকে কমবেশি লাভেই ব্যবসা চলছিল। কিন্তু ডিম কম দামে বিক্রি, ফ্লু মহামারিতে ২৫ শতাংশ মুরগি মারা যাওয়া এবং আরও ১৫ শতাংশ মুরগি মারা যাওয়ার আতঙ্কে উৎপাদন চলাকালে মুরগি বিক্রি করে দেওয়ার কারণে গত ৯ মাসে অস্বাভাবিক লোকসান হয়েছে।’ সব মিলিয়ে এ সময়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আগামী ৯ মাস যদি খামার গেট থেকে গড়ে ১১ টাকায় ডিম বিক্রি করা না যায়, তাহলে এই লোকসান থেকে উত্তরণের কোনো পথ থাকবে না।’
ডিম বেচাকেনায় জেলার মাইজদী পৌর বাজারের অন্যতম আড়ত ‘জনি স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন (৪৪) জানান, ‘দীর্ঘদিন লোকসান গুনতে গুনতে অনেক লেয়ার খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আবার একসময় ডিলাররা প্রান্তিক খামারিদের বাকিতে ফিড ও ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে খামার বন্ধ করেছেন। ফলে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ডিমের সরবরাহ কম।’
২৪ বছর ধরে ডিমের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ ডিম সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বাজারগুলোতে সরবরাহ করি। কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে খামার পর্যায়ে ডিমের দামও বেড়েছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দূরপাল্লার পরিবহন ব্যয়ও গাড়িপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়েছে; যা শেষ পর্যন্ত ডিমের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে ডিমের দাম সবচেয়ে বেশি পড়ছে।’
জেলার সোনাপুর জিরো পয়েন্ট এলাকার পাইকারি ডিম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘রবিউল হক ডিমের আড়ৎ’-এর মালিক আবদুর রহমান (৫৬) জানান, ‘আমরা খামারিদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার ডিম সংগ্রহ করে জেলার বিভিন্ন থানার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করি। গত কয়েক মাস আগে খামারিরা ডিম দেওয়ার জন্য ফোন করে পাগল করে ফেলতেন। আর গত ১৫-২০ দিন ধরে আমরা খামারে খামারে ঘুরেও এবং বেশি দামে অগ্রিম টাকা দিয়েও চাহিদামতো ডিম পাচ্ছি না।’
তিনি বলেন, ‘আগে চাহিদা কম ছিল, উৎপাদন বেশি ছিল। আর এখন খামারই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে চারটি শেডে ডিম উৎপাদন হতো, এখন সেখানে দুই বা তিনটি শেড চালু আছে। বেশি দাম দিয়েও ডিম পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরো জানান, ‘ঢাকার তেজগাঁও বাজার থেকে প্রতিদিন সকালে পাওয়া দরের ভিত্তিতে স্থানীয় পর্যায়ে দাম নির্ধারণ হয়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দাম ওঠানামা করতেই পারে। আজ (৭ মে) ৫০ হাজার ডিম কেনার চেষ্টা করে মাত্র ৩৫ হাজার ডিম পেয়েছি।’
প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে এই আড়তদার বলেন, ‘ডিমের ব্যবসায় সিন্ডিকেটের কোনো সুযোগ নেই। দাম বাড়লেই একটি গোষ্ঠী সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলে, যার কোনো ভিত্তি নেই। উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ– এই তিনটির যে কোনো একটিতে ব্যাঘাত ঘটলেই স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ে।’