এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১ জুলাই (২০২৬) থেকেই বহুল আলোচিত ‘নবম জাতীয় বেতন কাঠামো’ বা নবম পে-স্কেল কার্যকর করার জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে সরকার। নতুন এই বৈপ্লবিক বেতন কাঠামোর আওতায় দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত হবেন।
সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান লাগামহীন মূল্যস্ফীতির বাজারে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থার টেকসই উন্নয়ন করা এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক ব্যবধান কমিয়ে আনা। সম্প্রতি নবম জাতীয় পে-স্কেল চূড়ান্ত করতে গঠিত সচিব কমিটির এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নতুন কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত রোডম্যাপ আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্নস্তরের কর্মচারীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিগত ২১ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশন, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির দেওয়া সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে তিনটি প্রধান প্রতিবেদনের মধ্যে ইতিমধ্যে দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষ হয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে দেশের বাজেট সক্ষমতা ও নতুন ভাতা কাঠামোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগলেও নতুন বেতন কাঠামোর যাবতীয় আর্থিক সুবিধা ১ জুলাই থেকেই ব্যাকডেটে কার্যকর ধরা হবে। অর্থাৎ, পরবর্তীতে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হলে চাকরিজীবীরা জুলাই মাস থেকেই বকেয়াসহ বর্ধিত বা এরিয়ার বেতন ও সুবিধা একসঙ্গে পাবেন।
উল্লিখিত যে, দেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এই দীর্ঘ সময়ে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এই সংকট দূর করতে বর্তমানে নীতিনির্ধারকদের টেবিলে দুটি প্রস্তাবনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথম প্রস্তাব অনুযায়ী, সব গ্রেডের মূল বেতন বা বেসিক সমান হারে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এই নিয়ম কার্যকর হলে চতুর্থ গ্রেডের অধ্যক্ষদের বর্তমান ৫০ হাজার টাকার বেসিক বেড়ে দাঁড়াবে ৭৫ হাজার টাকায়, ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপকদের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক হবে ৫৩ হাজার ২৫০ টাকা এবং নবম গ্রেডের প্রভাষকদের ২২ হাজার টাকার বেসিক বেড়ে হবে ৩৩ হাজার টাকা।
নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুখবর
তবে প্রশাসনিক ভারসাম্যের জন্য সবার ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির মত থাকলেও মূল্যস্ফীতির চরম চাপ বিবেচনা করে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি নীতিনির্ধারকদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে। এই দ্বিতীয় বিকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের মূল বেতন সরাসরি দ্বিগুণ বা শতভাগ (১০০%) করা হতে পারে।
এই প্রস্তাবটি পাশ হলে ১১তম গ্রেডের শিক্ষকদের বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক একলাফে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছাবে। একইভাবে ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারীদের ৯ হাজার ৩০০ টাকার বেতন বেড়ে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কদের বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকার বেসিক বেড়ে সরাসরি ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হবে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বাজারের বর্তমান ঊর্ধ্বগতির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে নিম্ন আয়ের প্রান্তিক কর্মীদের ওপর, তাই তাদের সুরক্ষায় বিশেষ কোটা রাখা অপরিহার্য।
বাজেট অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে সরকার খুব শীঘ্রই এটি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। আগামী ৭ জুন বিকেল ৩টায় দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাজেট অধিবেশন’ আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ধারণা করছে, এই বাজেট অধিবেশনেই সরকারের আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক ব্যয়ের খতিয়ানের পাশাপাশি বহুল কাঙ্ক্ষিত নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত রূপরেখা ও বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।