এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও বিএনপি এবার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—দল ও দেশের প্রতি আস্থা, দক্ষতা-প্রজ্ঞা এবং সংকট মোকাবিলায় সাহস। দলটির দাবি, তাড়াহুড়া নয়; সর্বজনগ্রাহ্য ও যোগ্য ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের এখতিয়ার বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর থাকলেও প্রয়োজনে তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেও এ বিষয়ে পরামর্শ করতে পারেন। বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে।
তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই গ্রহণ করা হবে।’ জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রেখেই আমরা দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চাই।’
প্রায় একই ধরনের মতামত দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি বেছে নেবে; যিনি একই সঙ্গে হবেন দক্ষ, বিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি যার আনুগত্য রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করেছেন। সুতরাং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপরে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর আস্থা রয়েছে। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। জানা যায়, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু এখনই এ নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে-কে হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
পাশাপাশি বিএনপিই বা কেমন রাষ্ট্রপতি চায়, সেদিকেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি সচেতন জনগোষ্ঠীর নজর রয়েছে। বলা হচ্ছে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতি আনুগত্য বা বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির দক্ষতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্নে অতীতের ভালো এবং তিক্ত-দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় বিএনপি বিবেচনায় নেবে বলে দলটির মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। প্রথমত, দেশ ও দলের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস; দ্বিতীয়ত, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্রপতি পদের নেতা বা ব্যক্তির মধ্যে কিছুটা সাহস থাকাও প্রয়োজন বলে মনে করে দলটি। যেমন—১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতায় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। কিন্তু বিএনপির প্রতি তার আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ব্যর্থ হন বলে অনেকে মনে করেন। এর ফলে দেশে এক-এগারোর জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে তিনি বাধ্য হন। এরপর রাষ্ট্রপতি হিসাবেও তিনি সাহসী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। সার্বিকভাবে এর ফলাফল পুরোপুরি বিএনপির বিপক্ষে গেছে বলে আলোচনা আছে। অনেকের মতে, শুধু দলীয় আনুগত্য যে কাজে লাগে না, ইয়াজউদ্দিনের ঘটনায় তা প্রমাণিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আগের রাষ্ট্রপতিদের মতো নয়, বরং তাদের থেকে ভিন্নধারার ও যোগ্য একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করা প্রয়োজন। বিগত রাষ্ট্রপতিদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের আগের রাষ্ট্রপতিদের যোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল এবং তারা কেউ কেউ যথেষ্ট মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না।’
আদর্শ রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি ও প্রধান নাগরিক। তাই এই পদে একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন, মানসম্মত ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে বসানো উচিত। সরকার দেশের স্বার্থে একজন উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেবে, তেমনটাই প্রত্যাশা থাকবে।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নিছক রাজনৈতিক বিচারে বা দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া সমীচীন নয়। যদিও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত, তবুও জাতীয় সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব আনা প্রয়োজন, যার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে।’