এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে নতুন গতি আনতে দুটি যৌথ ব্যবসায়িক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)। একটি টাস্কফোর্স দুই দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে।
অন্যটি কাজ করবে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে ভারতীয় বিনিয়োগ ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে। একই সঙ্গে বেনাপোলসহ স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্য খালাসে সময় কমানো ও সীমান্ত বাণিজ্যে জটিলতা দূর করার ওপর জোর দিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার ঢাকায় সিআইআইয়ের ১৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দুই দিনের সফরে আসা প্রতিনিধিদলটি সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে দুদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে মূল আলোচনায় ছিল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বাধা দূর করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দুদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে বেনাপোলসহ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহণে বিদ্যমান জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহণে কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছেন। বেনাপোলে কার্গো হ্যান্ডলিং আরও দক্ষ করা গেলে পণ্য পরিবহণে সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে। এতে শুধু ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নয়, দুদেশের সামগ্রিক বাণিজ্যই উপকৃত হবে। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে শুধু শুল্ক কমানো বা নতুন চুক্তি করলেই হবে না। এর সঙ্গে যোগাযোগ, বন্দর, সড়ক, রেল, জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা যায় না। তবে দুই দেশের উন্নয়নের স্বার্থে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ যত বাড়বে, উভয় দেশই তত বেশি লাভবান হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক: সফররত ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। সেখানে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোয় গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অবস্থায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি, লজিস্টিক ও ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী অবকাঠামো, পরিবহণ ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানির সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে বৈঠক: সিআইআই প্রতিনিধিদল পরে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গেও বৈঠক করে। বৈঠকে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো, যৌথ বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দুদেশের বেসরকারি খাতের সরাসরি যোগাযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এ সময় ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতা চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, কীভাবে দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বাড়ানো যায়, সেটি নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বড় সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়েও কথাবার্তা হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিনিধিদলের আগমনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো- কীভাবে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সঙ্গে বিটুবি যোগাযোগ জোরদার করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সিআইআই প্রতিনিধিদল যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটিকে কাজে লাগিয়ে দুদেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা যাবে বলে আমরা মনে করি। এ সময় ব্যবসায়ী নেতা ও বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান, মীর নাসির হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন, ডিসিসিআইর সভাপতি তাসকিন আহমেদ, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মশিউর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে এফবিসিসিআই ও সিআইআইর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, দুদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে উভয়পক্ষের ব্যবসায়ী ও অংশীজন নিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজা জরুরি। সরকার মূলত নীতিমালা নির্ধারণ করে থাকে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকৃত সমস্যার কথা ভালো জানেন ব্যবসায়ীরাই। তাই এফবিসিসিআই ও সিআইআইর মতো শীর্ষ সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেলে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।