এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : আলমারির ওপর জমেছে ধুলো। ঘরের এক কোণে মাকড়সা জাল বুনেছে। বিছানায় শুয়ে সেসবই দেখেন হাসিনা পারভীন বিউটি (৪৬)। ইচ্ছে হয় উঠে ঘরটা পরিষ্কার করেন। ধুলো মুছে দেন, সংসারের চেনা কাজগুলোতে ফিরে যান। কিন্তু পারেন না। দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরলেও এখন বিছানাই তার নিত্যসঙ্গী। খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢোকে বাইরের আলো। সেই আলোয় তাকিয়ে থাকেন তিনি।
একসময় যে নারী হাসিমুখে সংসারের সব দায়িত্ব সামলেছেন, আজ সেই হাসিনাই নিজের শরীরটাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। রাজশাহী কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর করা বিউটির কাছে জীবনের এই হিসাব যেন কিছুতেই মেলে না।
একসময় স্বামী সাংবাদিক মো. বদরুল হাসান লিটন ছুটে বেড়াতেন সংবাদের সন্ধানে। পেশার প্রয়োজনে দিনের বড় একটা সময় বাইরে কাটাতেন। সংসারের খবর রাখার সুযোগও সবসময় হয়ে উঠত না। সেই সংসারের পুরো ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন হাসিনা।
ঘরে বাজার না থাকলে সামলেছেন। চাল শেষ হয়ে গেলে হিসাব মিলিয়েছেন। সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের প্রয়োজন- সবকিছু হাসিমুখে সামলেছেন বছরের পর বছর। কিন্তু আজ সেই মানুষটির জীবনই থমকে গেছে।
হাসিনার দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সপ্তাহে দুদিন ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সপ্তাহে ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসা ব্যয়ে প্রয়োজন হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
সাংবাদিক বদরুল হাসানের সীমিত আয়ে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে বাধ্য হয়ে সপ্তাহে একদিন ডায়ালাইসিস করিয়েই কোনোরকমে চিকিৎসা চালিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে। একদিকে স্ত্রীর চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসার ও সন্তানদের খরচ- সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পরিবারটি।
হাসিনার চিকিৎসায় আশার আলো হয়ে এগিয়ে এসেছেন তার বড় ভাই হারুন অর রশিদ। বোনকে কিডনি দিতে প্রস্তুত তিনি। প্রাথমিক পরীক্ষায় কিডনিও মিলেছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই খবরটি পরিবারের জন্য বড় আশার হলেও সেই আশার সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা অর্থ।
কিডনি প্রতিস্থাপনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। গয়না বিক্রি করে প্রায় ৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাকি প্রায় ৭ লাখ টাকা কীভাবে জোগাড় হবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা লিটন।
রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে পরিচিত এই মানুষটির কাছে এখন অর্থের প্রতিটি হিসাবই জীবন-মৃত্যুর হিসাব।
বিছানায় শুয়ে থাকা মায়ের চারপাশে ঘুরঘুর করে দুই মেয়ে। মায়ের অসুস্থতা তাদের ছোট্ট পৃথিবীতেও গভীর ছাপ ফেলেছে। ছোট মেয়েটির চাওয়া খুব সাধারণ- মা আবার তাকে বকুক। চুলে তেল দিয়ে ঝুঁটি করে দিক। নখে নেলপালিশ লাগিয়ে দিক। মায়ের বকা খেতেও রাজি সে। শুধু মাকে আগের মতো সুস্থ দেখতে চায়।
হাসিনা তাকিয়ে দেখেন স্বামী লিটনের মলিন মুখ। সংসারের দীর্ঘ পথচলায় অভাব-অনটন দেখেছেন, কিন্তু নিজের অসুস্থতার কারণে স্বামী-সন্তানদের এমন অসহায় অবস্থায় পড়তে হবে- এ হিসাব হয়তো কখনো করেননি।
একজন সাংবাদিকের জীবনের গল্প পাঠকের কাছে কখনো রোমাঞ্চকর, কখনো সংগ্রামের। কিন্তু সেই গল্পের আড়ালে তার পরিবারকে কতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বিউটির বর্তমান জীবন যেন তারই নির্মম বাস্তব উদাহরণ।
২৩ বছরের সংসার। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যে লিটন ছুটেছেন সংবাদের পেছনে, আর বিউটি সামলেছেন ঘর ও সন্তানদের। আজ সেই সংসারই স্ত্রীর চিকিৎসার টাকার জন্য মানুষের দ্বারে দাঁড়িয়েছে। পরিবারটির পক্ষ থেকে রাজশাহীসহ দেশের হৃদয়বান মানুষের কাছে সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে।
হয়তো একজনের পক্ষে ১০ লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক মানুষের সামান্য সহযোগিতা একত্র হলে এই অর্থ সংগ্রহ করা অসম্ভব নয়- এমনটাই আশা পরিবারের। সবার সহযোগিতাই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন।
হাসিনা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। মেয়েদের চুলে তেল দিয়ে ঝুঁটি করে দিতে চান। ধুলো জমা আলমারি মুছে ঘরটা গুছিয়ে নিতে চান। এই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথেই এখন সবচেয়ে বড় বাধা প্রায় ১০ লাখ টাকা। একটি পরিবারের কাছে এই ১০ লাখ টাকা শুধু অর্থ নয়- এটি একজন স্ত্রী, একজন মা এবং একজন মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা।