মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫০:২১

স্বর্ণের দাম নিয়ে নতুন ভবিষ্যদ্বাণী

স্বর্ণের দাম নিয়ে নতুন ভবিষ্যদ্বাণী

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : সোনার বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সবসময়ই কৌতূহল ও জল্পনা রয়েছে। অনেকদিন ধরে মূল্যবান এই ধাতুর দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বিশ্ববাজার থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার—সবখানেই সোনা কেনার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের গতিপ্রকৃতি কিছুটা বদলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আবার ফিরবে সোনা? নাকি এই চড়া দামি ট্রেন্ড বজায় থাকবে দীর্ঘকাল?

বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, স্বল্পমেয়াদে সোনার দামে আরও চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির কয়েকটি কারণ সোনার দামকে আবারও রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

এক মাসে বড় ওঠানামা
আগস্টের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৬৯৬ ডলারের কাছাকাছি উঠেছিল। ৩১ আগস্টও দাম ছিল প্রায় ৪ হাজার ৪৪৮ ডলার।

এক মাসের সর্বনিম্ন দামে সোনা, ভরি কত টাকা?
এরপর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে বাজারে বড় সংশোধন দেখা যায়। ১৬ সেপ্টেম্বর সোনার দাম প্রায় ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। পরদিন অবশ্য আবার দুই ২ শতাংশের বেশি বাড়ে। ১৭ সেপ্টেম্বর স্পট সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৩৬০ ডলার ৩৬ সেন্ট। অর্থাৎ আগস্টের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সোনার দাম প্রায় ৩০০ ডলারের বেশি কমেছে।

সামনে আরও কমার পূর্বাভাস
স্বল্পমেয়াদে সোনার বাজারে চাপ থাকার কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণগুলোতে ৪ হাজার ২৪০ থেকে ৪ হাজার ২৮০ ডলার অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অঞ্চল ধরে রাখতে না পারলে ৪ হাজার ২০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমেছে ৬৭ হাজার টাকা, বাংলাদেশে কত কমলো?
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জুলাইয়ের মধ্যবর্তী পূর্বাভাসেও একই ধরনের কথা বলা হয়েছিল। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হলে, বন্ডের ফলন বাড়লে এবং বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়লে সোনার দাম আরও কমতে পারে।

তাদের একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সোনার দাম বর্তমান পর্যায় থেকে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগের কথা বলা হয়েছিল। তবে এটি কোনো নিশ্চিত মূল্য পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৈরি একটি চিত্র।

সুদের হার ও ডলারের দিকে তাকিয়ে বাজার
সোনার দামের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার। সাধারণত সুদের হার ও বন্ডের ফলন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদবাহী সম্পদের আকর্ষণ বাড়ে। এতে কোনো সুদ না দেওয়া সোনার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাংলাদেশে সোনার দামের পার্থক্য কত?
সাম্প্রতিক সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশার পরিবর্তন সোনার বাজারকে প্রভাবিত করেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ফলন কমে যাওয়া এবং ডলার দুর্বল হওয়ায় সোনা আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ডলার ও সুদের হারের পরিবর্তনের সঙ্গে সোনার দামের সম্পর্ক এখনো বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ডলার শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে মূল্য নির্ধারিত সোনা অন্যান্য দেশের ক্রেতাদের জন্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে যায়। বিপরীতে ডলার দুর্বল হলে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে কী হতে পারে?
স্বল্পমেয়াদে দাম কমার সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন হতে পারে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল বলছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়ে বিনিয়োগের চাহিদা সোনার বাজারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। এশিয়ার বিনিয়োগকারী এবং ওটিসি বাজারের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও সোনার বড় ক্রেতা হিসেবে থাকতে পারে।

সোনা এখনই কিনবেন না অপেক্ষা করবেন? নজর রাখবেন যেদিকে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবে, ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার টন সোনা কিনেছে। এই চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে সমর্থন করতে পারে।

এ ছাড়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকতে পারেন।

রেকর্ড দামের পূর্বাভাস
রয়টার্সের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস তুলে ধরে বলা হয়েছিল, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদার কারণে ২০২৬ সালে সোনার দাম ছয় হাজার ডলারের দিকে যেতে পারে।

সোনার এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় চালক হতে পারে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ, বাণিজ্যিক সংঘাত বা বড় অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে যেতে পারেন।

দ্বিতীয় কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যদি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার অংশ বাড়াতে থাকে, তাহলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা তৈরি হবে।

তৃতীয় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমার সম্ভাবনা। সুদের হার কমলে বন্ড ও অন্যান্য সুদবাহী সম্পদের আকর্ষণ কমতে পারে। তখন সোনায় বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ার সুযোগ থাকে।

আবার কোন কারণে দাম কমতে পারে?
এর বিপরীত চিত্রও সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে এবং সুদের হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় উঁচু থাকলে সোনার দাম চাপে পড়তে পারে।

ডলার শক্তিশালী হওয়া এবং বন্ডের ফলন বাড়াও সোনার জন্য নেতিবাচক হতে পারে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে গেলে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের বিশ্লেষণও বলছে, শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাড়তি বন্ডের ফলন এবং তুলনামূলক শান্ত বৈশ্বিক পরিবেশ সোনার দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।

হাতের নাগালে আসার সম্ভাবনা কতটা?

সব মিলিয়ে, সোনার দাম আবার কিছুটা হাতের নাগালে আসার সুযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদে ৪ হাজার ২০০ ডলারের আশপাশে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা কিছু বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে বড় পতন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার, ডলারের গতিপথ, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার ওপর।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সোনার বাজারের একটি সম্ভাব্য সংশোধনের সময় হিসেবে দেখা যায়। একদিকে দ্রুত বেড়ে যাওয়া দামের পর মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দাম কমাতে পারে। অন্যদিকে কম দামে নতুন ক্রেতারা বাজারে ঢুকলে পতন সীমিতও হতে পারে।

বাংলাদেশের বাজারে কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশের বাজারের জন্য এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমলেও দেশে একই অনুপাতে দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

সোনার দাম কীভাবে নির্ধারণ হয়, কেন ওঠানামা করে?
ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার, আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারের মূল্য নির্ধারণও বাংলাদেশের সোনার দামে প্রভাব ফেলে।

ফলে বিশ্ববাজারে সোনার দাম আগামী দিনে কিছুটা কমলেও বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য সেই কমার পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, সেটি নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক দাম ও স্থানীয় বাজারের একাধিক সূচকের ওপর।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল, রয়টার্স, কয়েনডিসিএক্স

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে