বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৭:২৬

আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পদ্মার ভাঙন, ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক

আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পদ্মার ভাঙন, ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : শরীয়তপুরের জাজিরায় আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পদ্মার ভাঙন। উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলমখার কান্দী এলাকায় ভাঙনের কবলে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে মালয়েশিয়া প্রবাসী জুলহাস খানের বসতবাড়ি। এতে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন ধরে আলমখার কান্দী এলাকায় পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। গত কয়েক দিনে এ এলাকায় প্রায় ২০০ মিটারের বেশি নদীর তীর বিলীন হয়েছে বলে দাবি তাদের। এতে বসতবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি জমি ও স্থানীয় সড়ক ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ভাঙনের তীব্রতা বাড়লে প্রবাসী জুলহাস খানের বসতবাড়ির একটি অংশে ধস নামে। নদী ক্রমেই বাড়িটির কাছে চলে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ভবনটি পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় থেকে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা নিজের বাড়িটি চোখের সামনে নদীতে হারিয়ে যাওয়ায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে উদ্বেগ।

শুধু একটি বাড়ি নয়, ভাঙনের মুখে পড়ে এখন আশপাশের বহু পরিবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অনেকেই ঘরের টিনের চাল, দরজা জানালা, আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় অনেক পরিবার রাত জেগে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন।

আলমখার কান্দীর বাসিন্দা আক্কাস মিয়া বলেন, পদ্মা যেভাবে ভাঙছে, তাতে সামনে আরও অনেক বাড়িঘর নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে নদীর তীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে জাজিরায় পদ্মার এই ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে গত ১০ আগস্ট উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া কান্দি এলাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ১১০ মিটার নদীর তীর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের মুখে অন্তত ১০টি বসতঘর ও ছয়টি দোকান সরিয়ে নিতে হয়েছিল। ভাঙনের কবলে পড়ে স্থানীয়দের যোগাযোগের একমাত্র সড়কেরও বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কাথুরিয়া এলাকায় ওই ভয়াবহ ভাঙনের প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে থেকেই নদীভাঙন শুরু হয়েছিল। পরে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ১১০ মিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করলেও নদীপাড়ের মানুষের আতঙ্ক কাটেনি।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কাথুরিয়ার পাশাপাশি পালেরচর ইউনিয়নের ফরাজীকান্দি এবং পূর্ব নাওডোবার পৈলান মোল্যারকান্দিসহ কয়েকটি নদী তীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও বসতভিটার অংশ নদীতে চলে গেছে, আবার কোথাও সড়ক, ফসলি জমি ও দোকানপাট হুমকির মুখে পড়েছে।

পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে জাজিরায় প্রায় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীতীর সুরক্ষায় তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের পর নদীপাড়ের মানুষের কাছে প্রকল্পটি আশার আলো হয়ে উঠলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় সেই আশা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের একটি অংশের নকশা পরিবর্তন এবং প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের অনুমোদন পেতে সময় লাগায় কাজ নির্ধারিত সময়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের কাজের জন্য প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ অংশের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত সুরক্ষিত করার প্রত্যাশা থাকলেও বর্ষার আগে সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অসম্পূর্ণ অংশের আশপাশে নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে তারা অবগত আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নদীতীরবর্তী মানুষের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি যেসব এলাকায় বর্তমানে ভাঙন শুরু হয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগসহ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের আশঙ্কা, এখনই ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পানি ও স্রোত আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাজিরার আরও বহু পরিবারকে বসতভিটা হারাতে হতে পারে।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে