বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৪:১৬

ঢাবিতে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়া রুমা এখন বৃদ্ধাশ্রমে

ঢাবিতে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়া রুমা এখন বৃদ্ধাশ্রমে

মনিকা চৌধুরী, বরিশাল : জীবন সায়াহ্নে এসে দাঁড়ানো মানুষগুলো এখন কেবলই অতীত হাতড়ান। যে অতীত ছিল তাদের পরিপূর্ণ, যে পরিবারে ছিল পূর্ণাঙ্গ জীবন; বাবা-মা, স্বামী কিংবা স্ত্রী, সেই সঙ্গে তার ছেলে আর মেয়েরা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া জীবনে এসব প্রবীণদের এখন আর তারা কেউ খোঁজ নেন না। তাদের বুকে কথার পাহাড় জমলেও তা বলার মতো মেলে না কাউকে। 

বলছিলাম বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার বৃদ্ধাশ্রমের কথা। যেখানে বসবাস করেন ৭০ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। যাদের এখন আর খোঁজ নেয় না কেউ। এ বৃদ্ধাদের একজন রুমা বেগম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হলেও জীবনে মেলেনি ফার্স্টক্লাস। শেষ বয়সে এসে তার বুকে পাহাড়সমান কষ্ট। রুমার জীবনের গল্পটা যেন সাফল্য আর শূন্যতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন তিনি। একসময় মেধা আর স্বপ্ন দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। অথচ জীবনের শেষবেলায় এসে সেই রুমার দিন কাটছে আপনজনহীন এক বৃদ্ধাশ্রমে। একসময় চারপাশে ছিল পরিচিত মানুষ, ছিল নিজের বলে কিছু মানুষ। এখন দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি। নতুন সঙ্গীদের সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করেন। কথা বলেন। কিন্তু পুরোনো জীবনের কথা উঠলেই যেন থেমে যায় তার কণ্ঠ। সাফল্যের যে জীবন একসময় তাকে পরিচিতি দিয়েছিল, শেষ বয়সে এসে সেই জীবনেই সবচেয়ে বেশি অভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে আপন মানুষের। 

এ বৃদ্ধাশ্রমে রুমার মতোই দিন কাটছে আসমা, খাদেজা, অঞ্জলী, উষা রানী, বানু ও কহিনূর বেগমের। প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কিন্তু কষ্টের জায়গাটা প্রায় একই-আপনজনের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। আসমার জীবনে ছিল সংসার। ছিল আপনজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংসারের মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেছে। এখন তার দিনের বড় একটা সময় কাটে অন্য বৃদ্ধাদের সঙ্গে গল্প করে। তবু কথার মাঝখানে কখনো সন্তানদের প্রসঙ্গ এলে থমকে যান তিনি। খাদেজার কষ্টও অন্যরকম। সন্তানদের জন্য জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তাদের বড় করেছেন, সংসার সামলেছেন। কিন্তু আজ সেই সন্তানদের কাছেই তিনি যেন অতিরিক্ত একজন মানুষ। তাই শেষ বয়সে এসে ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। অঞ্জলী ও উষা রানীর জীবনেও রয়েছে আপনজন হারানোর বেদনা। কেউ দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে থেকেও একসময় বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। কেউ আবার ধীরে ধীরে হারিয়েছেন নিজের ঘরে নিজেরই থাকার অধিকার। বয়সের ভারে শরীর যখন আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কাছের একজন মানুষের। কিন্তু তাদের পাশে সেই মানুষটিই নেই। বানু আর কহিনূর বেগমও এখন এ বৃদ্ধাশ্রমেরই বাসিন্দা। কারও সঙ্গে কথা বলেন, কারও সঙ্গে পুরোনো দিনের গল্প করেন। কখনো হাসেন। আবার কখনো চুপচাপ বসে থাকেন। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা। 

অঞ্জলী রানী বলছিলেন, শেষ বয়সে এসে তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। সন্তানরা কাছে এসে একটু বসুক, দুটো কথা বলুক-এটিই যথেষ্ট। সারা জীবন যাদের জন্য করেছেন, তাদের কাছ থেকে এখন কোনো বড় চাওয়া নেই তার। শুধু একবার যেন মনে হয়, তিনি এখনো তাদের প্রয়োজনের মানুষ। বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সাখাওয়াত বলেন, এখানে থাকা প্রায় ৭০ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে কষ্টের গল্প। কেউ সন্তানদের অবহেলায় এসেছেন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অনেকেই এখনো স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করেন।-যুগান্তর

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।