এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর মাসটিকে টার্গেট করে নানা অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। জনমনে তৈরি করা হচ্ছে আতঙ্কের পরিবেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোথাও গুলি ছোড়াসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, কোথাও হুমকি-ধমকি আবার কোথাও বা অকারণে ঘটানো হচ্ছে ককটেল বিস্ফোরণ। এছাড়া মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করে পরিস্থিতি উত্তপ্তের চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দু-একটি স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার উদ্দেশ্য একটাই- জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা। জনমনে আলোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিনক্ষণ সামনে রেখেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে- কারা এমন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতই বা কারা।
তবে এসব ঘটনা আওয়ামী লীগ ঘটাচ্ছে, নাকি সরকারের ভেতর থেকে করা হচ্ছে- তা নিয়ে ‘সন্দেহ’ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির একজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এই বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ বলেন, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়াতে চাচ্ছে। তারা পুলিশ-প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এই অপচেষ্টা সফল হবে না।
তিনি বলেন, পুলিশ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সব ধরনের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাকে আইনের আওতায় আনছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সামনের দিনগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরালো হবে।
২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইকে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে প্রচার চালানোর একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসেম্বরকে টার্গেট করে জনমনে আতঙ্ক এবং আওয়ামী লীগকে নিয়ে আলোচনা তৈরির জন্যই এমন তৎপরতা চালানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য- সাধারণ মানুষ যেন স্বস্তিতে থাকতে না পারে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে বসে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সতর্ক আছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিচার হবে আইন অনুযায়ী।
তার মতে, আওয়ামী লীগ জন্ম থেকেই হিংস্র। ২৩ জুন তাদের জন্মতারিখ। আর সেই ২৩ জুনই পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য স্তিমিত হয়েছিল। যাদের স্বাধীনতা ভালো লাগে না, তাদেরই বিচরণ বেশি আওয়ামী লীগে। তারা জাতীয় সংসদের স্পিকারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। বিনা অপরাধে বহু মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, রক্ষীবাহিনী দিয়ে মানুষ মেরেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, তা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ঘটাচ্ছে; নাকি সরকারের ভেতর থেকে ঘটানো হচ্ছে, সেটি তদন্তের বিষয়। আওয়ামী সন্ত্রাসী বা অন্য কেউ এসব ঘটনা ঘটালে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক আতঙ্কের পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনেও। শনিবার ভোরে রাজধানীর মগবাজার এলাকার বিশাল সেন্টারের সামনে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় গাড়িতে না থাকায় আসিফ অক্ষত রয়েছেন।
তবে ভোরের দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় পুরো শোবিজ অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রাভিনেতা ওমর সানীসহ অনেকেই এ ঘটনাকে ‘অশনিসংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন।
পুরান ঢাকার হাজারীবাগে ২০ অক্টোবর একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ওইদিন সন্ধ্যায় মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট পরিহিত ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল কুরিয়ার সার্ভিসের গুদাম ও কার্যালয়ে হামলা চালানোর আগে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর ভেতরে ঢুকে তারা ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং ল্যাপটপ, রাউটার, এনভিআরসহ প্রায় ৩১ লাখ টাকার মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুরো এলাকার ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সুনির্দিষ্ট কিছু চক্র পরিকল্পিতভাবে সমাজে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে একটি চক্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন গুজব, উসকানিমূলক মাইকিং এবং জনমনে ভীতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। সুযোগ বুঝে দু-একটি জায়গায় অপরাধী ও চাঁদাবাজচক্র, কিশোর গ্যাং বা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশিষ্ট নাগরিক, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করে ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, মোবাইল ফোন কিংবা বেনামি বার্তার মাধ্যমে এ ধরনের হুমকি দিচ্ছে। এগুলো বেশির ভাগই দেওয়া হচ্ছে বিদেশি নম্বর থেকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়া বা মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করা।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমকর্মী, সুধী সমাজসহ সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের সম্পাদককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দৈনিক সাঙ্গুর প্রতিনিধি আজগর সালেহীকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনের মামলা এবং দুর্নীতি মামলার তদন্ত ও তদারকি কর্মকর্তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনায় যেসব পুলিশ কর্মকর্তা আওয়ামী আমলের প্রভাবশালী নেতা বা ক্যাডারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তাদের ব্যক্তিগত নম্বর সংগ্রহ করে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা এমন হুমকি দিচ্ছে। এছাড়া কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের ছবি এডিট করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, আবার কখনো বেনামি ফোনকলে মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারকে টার্গেট করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে সম্প্রতি দেওয়া এ ধরনের একটি হুমকির অডিও ভাইরাল হয়েছে।
শুধু পুলিশবাহিনী নয়; মাঠ প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীদের অবৈধ দখল ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ ছড়িয়ে সামাজিকভাবে তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে।
এদিকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি চক্র সুপরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসাবে খুলনা শহরকে হঠাৎ করেই যেন এক সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করে আলোচনায় আনা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভাগীয় এই শহর ও এর আশপাশের জেলাগুলোয় একের পর এক খুন, গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবশেষ শনিবার তেরখাদা উপজেলায় প্রকাশ্যে এক স্থানীয় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এর আগে ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনায় পৃথক দুটি স্থানে গুলিতে দুজন নিহত হন। এর মধ্যে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম নামের এক তরুণীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে আরেকটি ঘটনায় তুষার নামের এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
শনিবার খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিং সুধী সমাবেশে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। পুলিশি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পুলিশের একটি শাখা হিসাবে কমিউনিটি পুলিশিং এখন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তিনি বলেন, কিছু অপরাধী খুনের শিকার হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী খুন করছে। এসব নিয়ে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেউ বলছেন, বল প্রয়োগ করা হোক। বল প্রয়োগ করলে দেওয়া হচ্ছে ফ্যাসিস্ট পুলিশের তকমা। আবার বল প্রয়োগ না করলে বলা হয় পুলিশ দুর্বল। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর কোনো সুযোগ আমরা দেব না।
তিনি বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ যখনই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে যায়, তখন একশ্রেণির পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা ট্যাগ লাগিয়ে বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার কোথাও সামান্য শিথিলতা দেখা গেলে জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ দুই মুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ডিএমপি অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।