এমটিনিউজ ডেস্ক : ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে এখন আর শুরুতেই বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) BRTA Service Portal (BSP) ব্যবহার করে ঘরে বসেই শিক্ষানবিশ বা লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করা যায়। অনলাইনে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পাশাপাশি ফিও পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
তবে অনলাইনে আবেদন করলেই চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়া যায় না। লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহের পর প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং নির্ধারিত লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
নতুন করে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চাইলে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদনের নিয়ম এবং ফি সম্পর্কে আগে থেকেই জানা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
লাইসেন্সের জন্য প্রথম পদক্ষেপ কী?
নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের মাধ্যমে। সরাসরি স্মার্ট কার্ড বা ই-ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার সুযোগ নেই। প্রথমে লার্নার লাইসেন্স নিয়ে নির্দিষ্ট সময় প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এরপর বিআরটিএর দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করতে হবে।
এ জন্য বিআরটিএর BRTA Service Portal-এ নিবন্ধন করতে হবে। এই পোর্টালের মাধ্যমে লার্নার লাইসেন্স, স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়নসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়া যায়।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা
লাইসেন্সের ধরন অনুযায়ী আবেদনকারীর বয়সের শর্ত আলাদা। যেমন-
অপেশাদার লাইসেন্স: ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর।
পেশাদার হালকা লাইসেন্স: ন্যূনতম বয়স ২০ বছর।
পেশাদার মধ্যম লাইসেন্স: ন্যূনতম বয়স ২৩ বছর। পাশাপাশি অন্তত তিন বছর হালকা পেশাদার লাইসেন্স ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
পেশাদার ভারী লাইসেন্স: ন্যূনতম বয়স ২৬ বছর। এ ক্ষেত্রে অন্তত তিন বছর মধ্যম লাইসেন্স ব্যবহারের শর্ত রয়েছে।
এ ছাড়া আবেদনকারীকে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকাও আবশ্যক।
যেভাবে অনলাইনে লার্নার লাইসেন্সের আবেদন করবেন
অনলাইনে লার্নার লাইসেন্সের আবেদন কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা যায়। যেমন-
১. BSP-তে নিবন্ধন করুন
প্রথমে বিআরটিএর BRTA Service Portal-এ প্রবেশ করে নাগরিক হিসেবে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। নিবন্ধন শেষ হলে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
২. লার্নার লাইসেন্সের আবেদন নির্বাচন করুন
লগইন করার পর Driving License বিভাগ থেকে Learner License Application অপশন নির্বাচন করতে হবে। এরপর ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করে লাইসেন্সের ধরন নির্ধারণ করতে হবে।
৩. প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন
আবেদনের সময় সাধারণত যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়—
আবেদনকারীর নির্ধারিত মাপের ছবি
নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন অথবা পাসপোর্টের প্রমাণক
শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ
পরিচয়পত্রের ঠিকানার সঙ্গে বর্তমান ঠিকানা না মিললে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি বিল
ছবি ও অন্যান্য নথি আপলোডের ক্ষেত্রে পোর্টালে নির্ধারিত ফাইলের আকার এবং ফরম্যাট মেনে চলতে হবে। বিআরটিএর নির্দেশনায় ছবির সর্বোচ্চ আকার ১৫০ কিলোবাইট উল্লেখ রয়েছে।
৪. নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন
লার্নার লাইসেন্সের জন্য বিআরটিএর উল্লেখিত ফি হলো—
এক ক্যাটাগরি: ৫১৮ টাকা
দুই ক্যাটাগরি: ৭৪৮ টাকা
নির্ধারিত পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অনলাইনে ফি জমা দিতে হবে। পেমেন্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গেটওয়ে চার্জ যুক্ত হতে পারে।
৫. আবেদন শেষ করে লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহ করুন
সব তথ্য ও নথি জমা দিয়ে ফি পরিশোধের পর আবেদন সম্পন্ন হবে। এরপর পোর্টাল থেকে লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহ ও প্রিন্ট করা যাবে। এই লাইসেন্স পাওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ শুরু করতে হবে।
লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর করণীয়
লার্নার লাইসেন্স হাতে পেলেই চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। সাধারণত দুই থেকে তিন মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিআরটিএ নির্ধারিত তারিখ ও কেন্দ্রে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
এই পরীক্ষায় তিনটি অংশ থাকে—লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক বা ফিল্ড টেস্ট। পরীক্ষার দিন লার্নার লাইসেন্সের মূল কপি সঙ্গে রাখতে হবে। লিখিত পরীক্ষার জন্য কলমও সঙ্গে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
পরীক্ষায় কী কী যাচাই করা হয়?
ড্রাইভিং দক্ষতার পাশাপাশি সড়ক আইন ও ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে আবেদনকারীর জ্ঞানও যাচাই করা হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি বাস্তবে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোর সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয় ফিল্ড টেস্টে। তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে।
পরীক্ষায় পাস করার পর কী করবেন?
দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আবার BSP অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে হবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি জমা দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে।
পেশাদার লাইসেন্সের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বিআরটিএর বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন বর্তমানে প্রয়োজন হচ্ছে না।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি কত?
দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত লাইসেন্স ইস্যুর জন্য বিআরটিএর নাগরিক সনদে উল্লেখিত ফি হলো—
অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স: ৪ হাজার ৬২৮ টাকা
পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স: ২ হাজার ৮৩৮ টাকা
এই ফিও অনলাইনে জমা দেওয়া যায়। পেমেন্ট গেটওয়ের অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। বিআরটিএর পুরোনো ওয়েবপেজে কোথাও কোথাও ভিন্ন ফি দেখা যেতে পারে। তাই আবেদন করার সময় BSP-তে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি অনুসরণ করা উচিত।
লাইসেন্স পেতে কত সময় লাগে?
বিআরটিএর নাগরিক সনদে ই-ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ফি পরিশোধ ও অনুমোদনের পর এক কার্যদিবসের সেবার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ডাকযোগে লাইসেন্স পেতে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ কর্মদিবস লাগতে পারে।
তবে আবেদন যাচাই, তথ্যের অসংগতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সময়ের পরিবর্তন হতে পারে।
আবেদনের আগে যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
লার্নার লাইসেন্সের আবেদন করতে সাধারণত নিচের নথিগুলো হাতের কাছে রাখা ভালো—
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্ট
নিবন্ধিত চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট
নির্ধারিত মাপের ছবি
শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র
বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি বিল
ফি পরিশোধের তথ্য
চূড়ান্ত লাইসেন্সের আবেদনে অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
ঠিকানার তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
আবেদনের সময় স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া জরুরি। জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য পরিচয়পত্রে থাকা ঠিকানার সঙ্গে বর্তমান ঠিকানা আলাদা হলে বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী ইউটিলিটি বিলের মতো প্রমাণপত্র জমা দিতে হতে পারে। তাই আবেদন শুরুর আগেই পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ এবং ঠিকানাসংক্রান্ত নথির তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
ভুল তথ্য দিলে বাতিল হতে পারে আবেদন
ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনে কোনো ধরনের ভুল বা ভুয়া তথ্য দেওয়া উচিত নয়। বিআরটিএর সতর্কতা অনুযায়ী, আবেদনে মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেলে লার্নার লাইসেন্স ও স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
দালাল ছাড়াই কি লাইসেন্স করা সম্ভব?
হ্যাঁ, বিআরটিএর অনলাইন সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে নিজেরাই লার্নার লাইসেন্সের আবেদন, ফি পরিশোধ এবং পরবর্তী লাইসেন্সের আবেদন করা যায়। ফলে এ প্রক্রিয়ায় দালালের সহায়তা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
তবে অনলাইনে আবেদন করা গেলেও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার জন্য আবেদনকারীকে নির্ধারিত কেন্দ্রে সরাসরি উপস্থিত হতে হবে। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া ঘরে বসে শেষ করা সম্ভব নয়।