রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ০৮:২২:২৩

সিনেমাকেও হার মানাবে জার্মানির জয়ের এই নায়কের গল্প

সিনেমাকেও হার মানাবে জার্মানির জয়ের এই নায়কের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক : ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর টানা দুইবার বিশ্ব আসরের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়েছে জার্মানি। গতকাল (২০ জুন) আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে ৬৮ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকে সেই দুঃস্মৃতিই যেন ভেসে আসছিল জার্মান সমর্থকদের সামনে। কারণ এই ম্যাচে হারলে আবারও গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতো জার্মানদের। তবে দেনিজ উনদাভের কল্যাণে এবার তেমন কোনো বিপদ ঘটেনি জার্মানির।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানিকে একাই রক্ষা করেছেন উনদাভ। প্রথমে সমতা ফেরানোর পর অতিরিক্ত সময়ে এনে দেন জয়সূচক গোল। অথচ এই উনদাভ ছিলেন না শুরুর একাদশে। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে তাকে মাঠে নামান জার্মানির কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যান। আর মাঠে নামার ৯ মিনিটের মধ্যেই জালের দেখা পান এই স্ট্রাইকার। আর অতিরিক্ত সময়ে তার দ্বিতীয় গোলে নিশ্চিত হয় জার্মানির পরের রাউন্ড। 

কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানির প্রথম ম্যাচেও বেঞ্চ থেকে নেমে একটি গোল করেছিলেন উনদাভ। বদলি হিসেবে নেমে মাত্র দুটি ম্যাচে ৩টি গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট করেছেন এই স্ট্রাইকার, যার ফলে মাত্র দুই ম্যাচেই পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে কোনো বদলি খেলোয়াড়ের পক্ষে এটিই যৌথভাবে সর্বোচ্চ অবদান, ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের রজার মিলার রেকর্ডে ভাগ বসালেন তিনি।

 অবশ্য এই উনদাভের উত্থানটা তেমন সহজ ছিল না। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেছিলেন জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান। ফলে অনিশ্চিত হয়ে যায় বিশ্বকাপে তার জায়গা। অথচ সময় পাল্টে তিনিই এখন জার্মানির প্রধানতম অস্ত্র বলা চলে।
 
গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে বদলি নেমে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে শুরুর একাদশে খেলার ইচ্ছা পোষণ করেন কোচের কাছে, যা পছন্দ হয়নি নাগেলসম্যানের। ফলে দেখা দেয় প্রকাশ্যে মতবিরোধ। তবে বিশ্বকাপে এমন পারফরম্যান্সের পর কোচ নিজেই এখন বদল করতে যাচ্ছেন নিজের সিদ্ধান্ত। ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে উনদাভকে প্রথম একাদশে খেলানো হবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই। কেন আমি তার ছন্দ নষ্ট করতে যাব? সে দুবার বদলি হিসেবে নেমেছে, দুবারই গোল করেছে।’
 
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আরও একটি কীর্তি গড়েছেন উনদাভ। মিরোস্লাভ ক্লোসার পর বিশ্বকাপের নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার দিক দিয়ে দ্বিতীয় জার্মান ফুটলাবর বনে গেছেন তিনি। ক্লোসা এই কীর্তি গড়েছিলেন ২০০২ এর বিশ্ব আসরে।
 
বিশ্বকাপে আসার বন্ধুর পথ তো রয়েছেই, উনদাভের পেশাদার ফুটবলে যাত্রার পেছনেও রয়েছে প্রত্যাখ্যান ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি গায়ের ছোটখাটো গড়নের কারণে বাদ পড়েন ওয়ার্ডার ব্রেমেনের দল থেকে।
 
আর্থিক টানাপোড়েনে হতে পারছিলেন না পুরোদমে পেশাদার ফুটবলারও। ১৭ বছরে ১২০ ইউরো সাপ্তাহিক বেতনে জার্মানির সেমি-প্রফেশনাল চতুর্থ বিভাগের ক্লাব এইচভি হ্যালেভেলসে যোগ দিয়ে ফুটবল খেলা চালিয়ে যান কারাখানায় ৮ঘন্টা কাজের সঙ্গে ভারসাম্য ঠিক রেখে। যেখানে তিনি লেজার মেশিন পরিচালনা করতেন।
 
সেই কারখানায় কাজের স্মৃতি মনে করে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে উনদাভ বলেন, ‘ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতাম, কারখানায় কাজ করতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম। রাত ৮টার দিকে বাসায় ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবলের টাকায় বাঁচা সম্ভব ছিল না, তাই কাজ করতেই হতো।’
 
‘কিন্তু আমি আশা হারাইনি। ১৭ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের দল হাভেলসের সাথে চুক্তি করি, যেখানে ফুটবল খেলা ও অনুশীলনের পাশাপাশি একটি কারখানায় লেজার মেশিন অপারেটর হিসেবে পূর্ণকালীন ৮ ঘণ্টা কাজ করতাম।’
 
কারখানায় কাজ চালিয়ে গিয়েও ফুটবলে খুব দ্রুত সাফল্য দেখেছেন উনদাভ। ২০২০ সালে যোগ দেন বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলেইসে। ক্লাবটিকে শীর্ষ লিগে তুলতে রাখেন অনবদ্য ভূমিকা। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেই মৌসুমে ২৫ গোল করে সবার নজর কাড়েন। সেই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ডাক পান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটনে।
 
তবে ইংল্যান্ডে হতাশ করেন প্রথম মৌসুমে। ২২ ম্যাচে করেন মাত্র ৫ গোল। পরে তাকে ধারে পাঠানো হয় স্টুটগার্টে। ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে দলে ভেড়ায়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯ গোল করে গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় হন তিনি। তার ওপরে ছিলেন কেবল হ্যারি কেইন। আর সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাকে এনে দেয় জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা।
 
জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে এখন বিশ্বমঞ্চে জার্মানদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন উনদাভ। নাগেলসমান কুরাসাও এবং আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানির জয়গুলোতে আক্রমণভাগে আর্সেনালের কাই হাভার্টজকে প্রাধান্য দিলেও এখন উনদাভকে নিয়ে মূল পরিকল্পনা সাজাতে বাধ্য হচ্ছেন।
 
এ প্রসঙ্গে কোচ বলেন, 'সে সত্যিই বিশ্বকাপের জন্য নিজের সেরা ফর্মে রয়েছে। আমি তাকে মূল একাদশেও রাখতে পারি। প্রতিটি খেলোয়াড়ই শুরু থেকে খেলতে চায়, তবে আমি মনে করি সে যেভাবে আছে তাতেই খুশি, কারণ সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আমরা তার পারফরম্যান্সে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’
 
‘দেনিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিষ্কার, গত ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে সে আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। দেনিজের আলাদা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না, সে যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নেমে মানিয়ে নিতে পারে।’
 
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার পর নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে উনদাভ বলেন, ‘এটি একটি দারুণ অনুভূতি। গতবারও এটি পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হয়নি। এটি চমৎকার, একটি অসাধারণ অনুভূতি। ট্রফিটা পাওয়া আমার জন্য দারুণ ব্যাপার, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা ম্যাচটি জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছি, এখন দেখা যাক সামনে কী হয়।’
 
উনদাভের এমন ফর্ম চলমান থাকলে এবারের বিশ্বকাপের শীর্ষ তারকা হয়ে উঠতে পারেন তিনি।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে