স্পোর্টস ডেস্ক : শ্রীলঙ্কার মাটিতে হওয়ার কথা ছিল নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফির প্রথম আসর। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই আয়োজন এখন আর হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বত্ব সরিয়ে ভারতকে নতুন আয়োজক হিসেবে বেছে নিয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। এনডিটিভি’র প্রতিবেদন।
শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিররের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, আয়োজক স্বত্ব হারানোর কারণে দেশটির সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা। টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক প্রচার থেকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, আইসিসির সিদ্ধান্তে তা আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
মঙ্গলবার আইসিসি বোর্ড শ্রীলঙ্কা থেকে টুর্নামেন্টটি ভারতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। নতুন সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতে অনুষ্ঠিত হবে নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ম্যাচগুলো হবে মুম্বাই ও ভাদোদরায়।
আয়োজক স্বত্ব হারানোর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আইসিসির দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। বর্তমানে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড সরকার-নিযুক্ত একটি ট্রান্সফরমেশন কমিটির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। আইসিসির কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচিত প্রশাসনের পরিবর্তে সরকারি নিয়ন্ত্রণে বোর্ড পরিচালিত হওয়ায় আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
শ্রীলঙ্কা ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের সমাধান এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বোর্ড নির্বাচন আয়োজন না করলে আয়োজক স্বত্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে—এমন সতর্কবার্তা কয়েক মাস আগেই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে দিয়েছিল আইসিসি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন ক্রিকেট প্রশাসনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও তা সম্প্রতি পর্যন্ত ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিংবা প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের নজরে আনা হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইসিসির সিদ্ধান্তে বড় একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন হাতছাড়া হলো শ্রীলঙ্কার।
সরকারি হস্তক্ষেপ ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আইসিসির সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও একই ধরনের কারণে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন হারিয়েছে দেশটি।
২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছিল আইসিসি। বোর্ডের কার্যক্রমে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল নিষেধাজ্ঞার অন্যতম কারণ। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের পুরুষদের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপও শ্রীলঙ্কা থেকে সরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজন করা হয়।
অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে একই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দ্বিতীয়বারের মতো বড় আইসিসি ইভেন্টের আয়োজক হওয়ার সুযোগ হারাল শ্রীলঙ্কা। নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হারানোর পর দেশটির ক্রিকেট প্রশাসনের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
আয়োজক স্বত্ব হারানোর পর এখন শ্রীলঙ্কার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রিকেট বোর্ডের সাংবিধানিক সংস্কার ও নতুন নির্বাচন আয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রান্সফরমেশন কমিটির সদস্যরা আশা করছেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বড় কোনো বিলম্ব না হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের নতুন নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে সংস্কার ও নির্বাচন কত দ্রুত এবং আইসিসির প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন করা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৭ সালের নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নেবে ছয়টি দল। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টে জায়গা নিশ্চিত করেছে। ষষ্ঠ দল হওয়ার লড়াইয়ে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কা।
বর্তমান আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ষষ্ঠ এবং শ্রীলঙ্কা সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। ফলে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ছয়ে জায়গা করে নিতে পারলে শ্রীলঙ্কার টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ থাকবে।
আয়োজক স্বত্ব হারালেও শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তাই শেষ হয়ে যায়নি। যোগ্যতা অর্জন করে শীর্ষ ছয়ে থাকতে পারলে ভারতেই খেলতে পারবে তারা।
টুর্নামেন্টের ছয়টি দল একে অপরের বিপক্ষে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে খেলবে। অর্থাৎ প্রতিটি দল লিগ পর্বে পাঁচটি করে ম্যাচ খেলবে। এরপর পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুই দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ।
ভারতের হাতে নতুন বড় আয়োজন
শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে আয়োজক স্বত্ব কেড়ে নেওয়ার পর নারী ক্রিকেটের এই নতুন আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে ভারত। মুম্বাই ও ভাদোদরায় অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। ভারতের উন্নত ক্রিকেট অবকাঠামো ও বড় দর্শকবাজারকে কাজে লাগিয়ে টুর্নামেন্টটি বড় পরিসরে আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার জন্য এটি কেবল একটি ক্রিকেট আয়োজন হারানোর ঘটনা নয়; বরং বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও হাতছাড়া হয়েছে। টুর্নামেন্ট উপলক্ষে পর্যটক, দর্শক, খেলোয়াড় ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আগমন, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিশ্বজুড়ে প্রচারের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশা ছিল, তা এখন আর পূরণ হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রশাসনিক সংকট দ্রুত সমাধান করতে না পারলে ভবিষ্যতেও আরও আন্তর্জাতিক আয়োজন হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে শ্রীলঙ্কা। নারী চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজক স্বত্ব হারানোর ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে।