শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২০:০৯

মেসির অভাব পূরণে দলে কে এই লিওনেল?

মেসির অভাব পূরণে দলে কে এই লিওনেল?

স্পোর্টস ডেস্ক : আর্জেন্টিনা দল থেকে বিদায় নিয়েছেন লিওনেল মেসি। তার জায়গা পূরণ করা যে আর্জেন্টিনার জন্য সহজ হবে না, তবে মেসি-পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন কিছু প্রতিভা। 

সত্যি বলতে বেনিনের বিপক্ষে জাতীয় দলে সেদিন দুজন লিওনেল খেলেছেন। একজন লিওনেল মেসি। যার বিদায়ী ম্যাচ ছিল সেটা। অন্যজন লিওনেল ফ্লোরেস।

লিওনেল মেসি যিনি একজন কিংবদন্তি ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, যার নামে ঘরবাড়ি ভরে আছে ছবিতে, পোস্টারে, স্মৃতিতে।

আরেকজন ১৮ বছরের এক কিশোর, যার পরিচয় মাত্র লেখা শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বোকা জুনিয়র্সের দ্বিতীয় দল থেকে জায়গা করে নিয়েছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। উত্থানটা এতটাই দ্রুত যে লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচেও দেখা গেছে তার উপস্থিতি। বদলি নেমে সেদিন খেলেছেন মিনিট পনেরো।

লিওনেল ফ্লোরেসের জন্ম ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জায়গাটা ভিয়া লা কাভা, বুয়েনস এইরেসের উত্তরে সবচেয়ে গরিব এলাকাগুলোর একটির বস্তি। তবে ‘লিও’ কিংবা ‘ফ্লোরেস’ নয়, সবাই তাকে ডাকে ‘বেনজা’ নামে। তার পুরো নাম যে লিওনেল বেনজামিন ফ্লোরেস!

 খুব অল্প বয়সেই ফ্লোরেসের প্রতিভা চোখ এড়ায়নি বোকা জুনিয়র্সের স্কাউটদের। সাত বছর বয়সে তিনি ঢুকে পড়েন বোকা জুনিয়র্সের একাডেমিতে। তারপর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে রোজ ভোর পাঁচটায় উঠে বাস ধরে অনুশীলনে যাওয়া। স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে কেটে গেছে শৈশবের অনেকটা সময়।

ফল এল ধাপে ধাপে। একাডেমির প্রতিটি স্তর পেরোতে পেরোতে এক ম্যাচে করলেন পাঁচ গোল। একবার করলেন কর্নার থেকে সরাসরি গোল, যাকে ফুটবলের ভাষায় বলে অলিম্পিক গোল। শিশু বয়সের সেই ছেলেটি তখনো জানত না, ভোরের বাস তাকে একদিন কোথায় পৌঁছে দেবে।

গত জুলাইয়ে এল প্রথম বড় সুযোগ। বোকার কোচ আরুয়াবারেনা তাকে অভিষেক করালেন। আর সেই কিশোর মাঠে নেমে গোল করে প্রতিদান দিলেন আস্থার। সেপ্টেম্বরে ডাক এল জাতীয় দলের। কোচ স্কালোনি বলিভিয়ার বিপক্ষে তাকে নামালেন বদলি হিসেবে।

এরপরের সাতটা দিন যেন আসলেই রূপকথার মতো গল্প। আলবিসেলেস্তের হয়ে অভিষেক বলিভিয়ার বিপক্ষে। তারপর বোকায় ফিরে উনিয়ন দে সান্তা ফের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি নেমে জোড়া গোল। এরপর আবার জাতীয় দলের জার্সিতে বুরকিনা ফাসো ও বেনিনের বিপক্ষে খেললেন। সাত দিনে চার ম্যাচ।

১৮ বছরের এক কিশোর শরীরে এই ধকল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্লোরেসের শরীর আসলে আগেও এই ধকল সয়েছে। প্রথম কোচ ক্রিস্তিয়ান বেনিতেস আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ওলেকে বলেছেন, ‘সান ইসিদ্রোর পাড়ার ক্লাব এল সোরসালে পাঁচ বছর বয়সেই ছেলেটি ওভারহেড কিক করত। অনুশীলনে আমার ছেলে বল ছুড়ে দিত আর ও ওভারহেড কিক করত। সব বল জালে জড়াত।’

ফ্লোরেসকে নিয়ে নিজের মুগ্ধতা জানাতে গিয়ে ক্রিস্তিয়ান বেনিতেস বলেছেন, ‘আমি রিভার প্লেটের সমর্থক। কিন্তু এখন বোকার ম্যাচ দেখি। ভাবুন, আমার কেমন লাগে। আমি দেখি ওর জন্য। এখন ওর গোলে আমিও উদ্‌যাপন করি।’

 তারপর রসিকতা করে বলেছেন, ‘আমার বাড়িতে যদি কোনো দিন বোকার কোনো জার্সিটা ঢোকে, সেটা শুধু ওরই হবে।’ এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কী হতে পারে!

ফ্লোরেস মূলত ফরোয়ার্ড। ডান পা-টা বেশ শক্তিশালী। গতি দুর্দান্ত। খেলতে পারেন উইংয়ের দুই পাশে, নিখাদ স্ট্রাইকার হিসেবে, কিংবা মূল স্ট্রাইকারের ঠিক পেছনে। নিজেই বলেছেন, ৭, ৯, ১০ বা ১১ নম্বর, যেখানে দরকার সেখানেই খেলতে স্বাছন্দ্যবোধ করেন। ড্রিবলিংকে নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র মনে করেন। আদর্শ হিসেবে নাম নিয়েছেন মেসি আর হুয়ান রোমান রিকেলমের। তবে ওয়ান-টু-ওয়ানের লড়াইয়ে নিজেকে ধারালো করতে বেশি বেশি দেখেন জেরেমি ডোকু ও জামাল মুসিয়ালার খেলা। মানে ফ্লোরেস শুধু স্বপ্ন দেখেন না, হোমওয়ার্কও করেন।

বোকার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচে তার গোল ৪টি, সহায়তা ৩টি। বোকার দ্বিতীয় দল আর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৬ ম্যাচে ১৩ গোল ও ৭ সহায়তা। জাতীয় দলের কোচ স্কালোনিরও তাকে নিয়ে অনেক আশা, ‘ফ্লোরেস খুব ভালো করছে। আমাদের ওর যত্ন নিতে হবে। ওর পাশে থাকতে হবে, সমর্থন দিতে হবে। ও আর ফ্রাঙ্কো (মাস্তানতুয়োনো) তরুণ খেলোয়াড়, যারা আমাদের আনন্দ দেবে।’

যত্ন নেওয়ার কথাটা খেয়াল করার মতো। কোচ বলছেন না ‘ওকে ব্যবহার করব’, বলছেন ‘ওর পাশে থাকতে হবে’। কারণ, আর্জেন্টিনা জানে, প্রতিভা যত দ্রুত ওঠে, ভেঙে পড়তে সময় লাগে তার চেয়েও কম।

এরই মধ্যে যে ফ্লোরেসের ওপর ইউরোপের ক্লাবগুলোর নজর পড়েছে, সেটা না বললেও চলে। ট্রান্সফারমার্কেটে তার বাজারমূল্য এখন ৮০ লাখ ইউরো। জাতীয় দলে নিয়মিত হওয়ার পর এই অঙ্ক বাড়বে, সেটা প্রায় নিশ্চিত। বোকা তার চুক্তি বাড়িয়ে নিয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সঙ্গে বসিয়েছে দুই কোটি ডলারের রিলিজ ক্লজ। ফ্লোরেস প্রথম দলে খেলা শুরুর পর থেকে বোকা টানা ১৬ ম্যাচে অপরাজিত। মৌসুম শেষে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বোকাকে। যদি না এর মধ্যেই ইউরোপের কোনো ক্লাব রিজিজ ক্লজ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে না ফেলে।

ফ্লোরেসের সামনে এখন সেই দীর্ঘ পথ। আপাতত তার কাজ একটাই, মাঠে নিজের গল্পটা লিখে যাওয়া। তারপর সময়ই ঠিক করে দেবে, তিনি শুধু আরেকজন ‘পরবর্তী মেসি’ হয়ে হারিয়ে যাবেন, নাকি হয়ে উঠবেন ‘প্রথম বেনজা’!

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।