স্পোর্টস ডেস্ক : ক্রিকেটের ইতিহাসে সময়ের সঙ্গে বদলেছে খেলার ধরন, এসেছে নতুন প্রযুক্তি, আর ব্যাটিংয়েও ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। টেস্টের ধৈর্যশীল ব্যাটিং থেকে ওয়ানডের আগ্রাসী মেজাজ, কিংবা টি-টোয়েন্টির ঝোড়ো ব্যাটিং—তিন ফরম্যাটেই নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন অসংখ্য কিংবদন্তি।
তবে সব যুগ ও ফরম্যাট বিবেচনায় ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটার কারা, সেই আলোচনা আজও সমান জনপ্রিয়। আবার সেরা ব্যাটারের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকমও হতে পারে।
ক্যারিয়ারের রান, ব্যাটিং গড়, সেঞ্চুরি, ধারাবাহিকতা, প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য এবং ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য বিবেচনায় সর্বকালের সেরা ১০ ব্যাটারের একটি তালিকা তৈরি করা যায়। যদিও এই তালিকা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, তবু ক্রিকেট ইতিহাসে কয়েকজন ব্যাটারের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলক কম। চলুন ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা এমন ১০ ব্যাটার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-
১. ডন ব্র্যাডম্যান (অস্ট্রেলিয়া)
ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের আলোচনায় সবার আগে আসে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নাম। টেস্ট ক্রিকেটে ৯৯.৯৪ গড় এখনো তার অসাধারণ শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। মাত্র ৫২ টেস্টে ৬ হাজার ৯৯৬ রান এবং ২৯টি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। টেস্টে তার এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য ব্যাটারদের একজন করে রেখেছে।
২. শচীন টেন্ডুলকার (ভারত)
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শচীন টেন্ডুলকারের তুলনা পাওয়া কঠিন। টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ৩৪ হাজার ৩৫৭ রান এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি সেঞ্চুরি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। টেস্টে ১৫ হাজার ৯২১ এবং ওয়ানডেতে ১৮ হাজার ৪২৬ রান করে তিনি দুই ফরম্যাটেই সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে অবসর নেন। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন এই কিংবদন্তি।
৩. স্যার ভিভ রিচার্ডস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে ভিভ রিচার্ডস অন্যতম। তার সময়ের বোলারদের ওপর দাপট দেখানোর পাশাপাশি টেস্ট ও ওয়ানডে—দুই ফরম্যাটেই অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছেন তিনি। টেস্টে ৮ হাজার ৫৪০ এবং ওয়ানডেতে ৬ হাজার ৭২১ রান করেন রিচার্ডস। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আগ্রাসী ব্যাটিংয়েও তার খেলার ধরন মানানসই হতো বলে মনে করেন অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক।
৪. ব্রায়ান লারা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
নান্দনিক ব্যাটিং, বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতা এবং রেকর্ড গড়ার দক্ষতায় ব্রায়ান লারা ছিলেন অনন্য। টেস্ট ক্রিকেটে তার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ অপরাজিত ৪০০ রান, যা এখনো পুরুষদের টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। টেস্টে ১১ হাজার ৯৫৩ এবং ওয়ানডেতে ১০ হাজার ৪০৫ রান করেছেন তিনি। প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে একাই চাপে ফেলার ক্ষমতা তাকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে জায়গা দিয়েছে।
৫. কুমার সাঙ্গাকারা (শ্রীলংকা)
শ্রীলংকার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটার কুমার সাঙ্গাকারা। নিখুঁত টেকনিক, ধারাবাহিকতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার দক্ষতায় তিনি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন। টেস্ট ও ওয়ানডে—দুই ফরম্যাটেই তার পারফরম্যান্স ছিল ঈর্ষণীয়। উইকেটকিপার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, যা তার ক্রিকেটীয় দক্ষতাকে আরও বিস্তৃত করেছে। টেস্ট ক্রিকেটে তার মোট রান ১২ হাজার ৪০০, ওয়ানডেতে ১৪ হাজার ২৩৪ এবং টি-টোয়েন্টিতে ১ হাজার ৩৮২।
৬. রিকি পন্টিং (অস্ট্রেলিয়া)
অস্ট্রেলিয়ার সোনালি যুগের অন্যতম প্রধান ব্যাটার রিকি পন্টিং। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বড় ম্যাচে রান করার জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৭ হাজারের বেশি রান করেছেন পন্টিং। অধিনায়ক হিসেবেও বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা তার ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
৭. জ্যাক ক্যালিস (দক্ষিণ আফ্রিকা)
জ্যাক ক্যালিস মূলত অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যাটার হিসেবেও তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন। টেস্টে ১৩ হাজার ২৮৯ এবং ওয়ানডেতে ১১ হাজার ৫৭৯ রান করেছেন তিনি। দুই ফরম্যাটেই তার ব্যাটিং গড় ছিল ৫০-এর ওপরে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রান করার সামর্থ্য তাকে এই তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
৮. বিরাট কোহলি (ভারত)
আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার বিরাট কোহলি। বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে রান তাড়া করার দক্ষতা, চাপের মধ্যে ব্যাটিং এবং ধারাবাহিক সেঞ্চুরি করার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। শচীন টেন্ডুলকারের ওয়ানডে সেঞ্চুরির রেকর্ডও ভেঙেছেন তিনি। তিন ফরম্যাটেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন এই ভারতীয় তারকা।
৯. সুনীল গাভাস্কার (ভারত)
টেস্ট ক্রিকেটে দুর্দান্ত ওপেনিং ব্যাটিংয়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন সুনীল গাভাস্কার। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে তার সাফল্য ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টেস্টে ১০ হাজারের বেশি রান করা প্রথম ব্যাটার ছিলেন তিনি। কঠিন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকার ক্ষমতা তাকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে।
১০. এবি ডি ভিলিয়ার্স (দক্ষিণ আফ্রিকা)
ব্যাটিংয়ের বহুমুখিতা ও উদ্ভাবনী শট খেলার জন্য এবি ডি ভিলিয়ার্স ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটেই নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। মাঠের চারদিকে শট খেলার ক্ষমতা এবং অল্প সময়ে ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সামর্থ্য তাকে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটারে পরিণত করেছে। তিন ফরম্যাটের সকল আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিতে তার মোট রান ২০ হাজারের বেশি।
সর্বকালের সেরা ব্যাটার নির্ধারণ করতে গেলে ভিন্ন যুগের ক্রিকেটারদের তুলনা করা কঠিন। ব্র্যাডম্যানের টেস্ট গড় অবিশ্বাস্য, শচীন টেন্ডুলকারের আন্তর্জাতিক রান ও সেঞ্চুরির রেকর্ড অনন্য, আর বিরাট কোহলি আধুনিক সাদা বলের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার অসাধারণ উদাহরণ।
অন্যদিকে, ভিভ রিচার্ডসের আগ্রাসন, ব্রায়ান লারার বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য এবং রিকি পন্টিংয়ের বড় ম্যাচে পারফরম্যান্সও তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি জোরালো করে।
টেস্ট ক্রিকেটে আধিপত্যের বিচারে ডন ব্র্যাডম্যান এবং তিন ফরম্যাটে দীর্ঘমেয়াদি অর্জন ও ধারাবাহিকতার বিচারে শচীন টেন্ডুলকারের নাম সবার আগে আসে। তবে ক্রিকেটের সেরা ব্যাটার বেছে নেওয়া শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ব্যক্তিগত পছন্দ, পরিসংখ্যান এবং কোন যুগের ক্রিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।