বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ০১:৪৫:১৯

ওলটপালট হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি!

ওলটপালট হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি!

বিল্লাল হোসেন রবিন : নাসিক নির্বাচনের ফলাফলে ওলটপালট নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই শিবিরেই নতুন মেরূকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় রাজনীতির অঙ্গনে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয়কে বিএনপি দেখছে একভাবে অন্যদিকে বিএনপির পরাজয়কে আওয়ামী লীগ দেখছে আরেকভাবে।

তবে দুই দলের মাঠ নেতাকর্মীরা দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তাদের মতে, পরিচ্ছন্ন রাজনীতির একটা আবহ তৈরি হয়েছে এবারের সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে। বিশেষ করে দলীয় প্রতীকের বাইরে দুই প্রার্থীই ছিলেন ক্লিন ইমেজের। আর ক্লিন ইমেজ নির্বাচনে একটা বড় ভূমিকা রাখে তার প্রমাণ নাসিক নির্বাচন।

ফলে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে লড়াই হলেও দুই প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজকে বড় করে দেখেছেন ভোটারদের একটি অংশ। আর ওই ইমেজের জোরে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানও কম ভোট পাননি। তার ভোটের পাল্লায়ও যোগ হয়েছে প্রতীকের বাইরে ব্যক্তি ইমেজের ভোট। এমনটাই মনে করছেন দুই দলের অনেক নেতাকর্মী।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, নাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে সাখাওয়াত হোসেন খান দলের মধ্যে একটা জায়গা করে নিয়েছেন। অন্যদিকে সেলিনা হায়াৎ আইভীও আওয়ামী লীগে একটি বলয় তৈরি করে ফেলেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা মনে করছেন ক্লিন রাজনীতির প্লাটফরম হচ্ছেন আইভী।

জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ ও দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় তাকে নিয়ে আগামীতে আশার আলো দেখছেন নেতাকর্মীরা। গতবার মেয়র থাকলেও দলের ভেতর তার কোনো পদপদবি ছিল না। ফলে জোরালোভাবে তিনি এখন দল নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পবেন।

বিএনপি: বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বিএনপির তিন নেতা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, তিনবারের সাবেক এমপি আবুল কালাম ও সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনকে নির্বাচন করার জন্য চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন। কিন্তু তিনজনের কেউ নির্বাচনে করতে রাজি হননি। পরে চেয়ারপারসন এ তিন নেতাকে ডেকে সাখাওয়াত হোসেন খানের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

তিনজনের মধ্যে তৈমূরকে নারায়ণগঞ্জ শহর, গিয়াসউদ্দিনকে সিদ্ধিরগঞ্জ ও আবুল কালামকে বন্দরের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। এরপর কেন্দ্র থেকে গত ৫ই ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে বিএনপির ৫৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা নাসিকের ২৭ ওয়ার্ডে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণার জন্য নারায়ণগঞ্জ ছুটে আসেন। বাদ যাননি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুই দফা তিনি নারায়ণগঞ্জে দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান।

তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সরব উপস্থিতি আর প্রচারণার পরও পরাজয় বরণ করেন সাখাওয়াত হোসেন খান। শহরে ক্যাম্প স্থাপনের জায়গা না থাকায় শেষতক শহরের কালিরবাজারে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর বাসায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে ওই ক্যাম্পটি চাঙ্গা থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতারা যতক্ষণ নারায়ণগঞ্জ ছিলেন ততক্ষণ বিএনপি শিবির চাঙ্গা থাকলেও ২০শে ডিসেম্বর থেকে একেবারে ফাঁকা হয়ে পড়ে বিএনপির দলীয় কার্যালয় আর নির্বাচনী ক্যাম্প। তৈমূর আলম খন্দকার তার ভাইকে বিজয়ী করতে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে, গিয়াস উদ্দিন তার ছেলেকে বিজয়ী করতে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ও আবুল কালাম তার ছেলেকে বিজয়ী করতে ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ফলে উত্তপ্ত ভোটের মাঠ নির্বাচনের ২দিন আগে নীরব হয়ে যায়। এমনকি ২২শে ডিসেম্বর ভোটের দিনও নাসিকের ৮০ ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দেখা যায়নি। পোলিং এজেন্ট ছিল না বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জের অনেক বুথে।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, সাখাওয়াত হোসেনকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেনি স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও তাদের অনুসারী নেতা-কর্মীরা। সে কারণেই শুধুমাত্র ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখানোর জন্যই মাঠে নেমেছিল ওই নেতা ও তাদের কর্মীরা। তাছাড়া নির্বাচন চলাকালীন প্রচণ্ড সমন্বয়হীনতা, স্থানীয় নেতাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রের তৎপরতার কারণে মাঠ পর্যায়ের কেউ মুখ খুলেনি। কিন্তু ২২শে ডিসেম্বর ভোটের দিন সেটার প্রভাব পড়ে।

ভোটের দিন অনেক আত্মবিশ্বাসী বিএনপির ভরাডুবির পর ইতিমধ্যে কেন্দ্রে কারণ জানতে ডেকেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, সাবেক দুইজন এমপি আবুল কালাম ও গিয়াসউদ্দিন। এ তিনজনকে যথাক্রমে শহর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। মেয়র পদে বিএনপির ভরাডুবি ঘটলেও গিয়াসউদ্দিনের ছেলে গোলাম সাদরিল ও তৈমূরের ভাই মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ কাউন্সিলর পদে জিতেছেন। ১৭৪টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১৫টি কেন্দ্রে বিজয়ী হয়েছে ধানের শীষ।

বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতেও আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ এ নেতৃত্ব ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ কারণে আগামীতে বিএনপির কমিটিতে পরিবর্তন হতে পারে। তাছাড়া বিএনপির জেলা কমিটি ইতিমধ্যে ৭ বছর পার করেছে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ হয়নি। মহানগর কমিটিও এখনো গঠন করা হয়নি। ৭ বছর ধরেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে শহর কমিটি। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির মেয়াদও ইতিমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

সিটি করপোরেশনের ভোটের পর তিক্ত অভিজ্ঞতায় এবার কমিটিতেও আমূল পরিবর্তন আসতে পারে জানিয়েছেন নেতারা। নগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামাল বলেন, আমাদের মহানগরের কমিটি নেই। যে কারণে সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কমিটি থাকলে হয়তো আরো ভালো কিছু হতো। তবে এখন সময় এসেছে কমিটি পুনর্গঠনের।

জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব জানান, ব্যক্তি দুই একজন ছাড়া সাখাওয়াত কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে তার পরিকল্পনা বা কীভাবে উনি কাজ করতে চান বা নেতা-কর্মীদের কীভাবে কাজ করতে হবে বা কি করা উচিত এ ধরনের কোনো নির্দেশনা তো দেননি বরং হায় হ্যালো বলার মতো সামান্যতম সৌজন্যবোধ দেখাতেও ছিলেন কৃপণ। উনি চরমভাবে অবহেলা করেছেন প্রত্যেক ওয়ার্ডের বিএনপিসহ সকল অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের। তবে আমরা চাই সব কমিটিতে যোগ্য নেতারা আসুক।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার জানান, আমরা ব্যর্থ না বরং বলবো সফল। একেবারে নতুন একজন প্রার্থীকে নিয়ে লড়তে আমাদের কষ্ট হলেও লড়েছি। কমিটি পুনর্গঠন হলে গতি বাড়বে। এখন চেয়ারপারসন কী করেন সেটাই দেখার বিষয়।

আওয়ামী লীগ: গত ৯ই অক্টোবর গঠন করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আংশিক কমিটি। কেন্দ্র থেকে ঘোষিত কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আবদুল হাই, সহ-সভাপতি হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সেক্রেটারি পদে আবু হাসনাত শহীদ বাদলের নাম ঘোষণা করা হয়। এ তিনজনের মধ্যে বাদল হলেন এমপি শামীম ওসমানের অনুগামী।

কমিটি গঠনের পর পূর্ণাঙ্গ করতে কেন্দ্রে বাদল একটি কমিটি জমা দিলেও কোনো অনুমোদন হয়নি। এর মধ্যে কেন্দ্রে মহানগর আওয়ামী লীগ মেয়র পদে প্রস্তাবিত যে তালিকা পাঠিয়েছিল সেখানে আইভীর নাম ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষতক আইভীকে মনোনয়ন দিয়েই সুষ্ঠু ভোটে জয়ী করে নেন। । নৌকা প্রতীক ও আইভীর ব্যক্তি ইমেজ বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, আইভী আবারও মেয়র হওয়ায় এবার জেলা কমিটিতেও তার প্রাধান্য থাকবে। গতবছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত মহানগর কমিটিতে স্থান হয়নি আইভীর। ওই কমিটিতে আইভী পন্থিদেরও মূল্যায়ন হয়নি। সে হিসেবে আগামীতে জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে আবারও ব্যাকফুটে থাকা আইভী সমর্থকদের ঠাঁই হবে ধারণা করা হচ্ছে। জেলার সভাপতি আবদুল হাই শুরু থেকেই আইভীর নির্বাচনী পরিচালনাতে ছিলেন।

তাছাড়া শামীম ওসমানদের সঙ্গে তার দূরত্বও বাহ্যিকভাবে পরিলক্ষিত। কারণ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিশেষ করে শামীম ওসমানপন্থিরা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চন্দন শীলের নাম প্রস্তাবনা করেছিলেন। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী এখানে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন যার নাম মেয়র পদের মনোনয়নের জন্য পাঠানো হয়েছিল তাকেই চেয়ারম্যান হিসেবে মনোয়ন দেন।

তিনি এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হয়েছেন। ২২শে ডিসেম্বর ভোটের পরদিন ২৩শে ডিসেম্বর আবদুল হাই ও আনোয়ার হোসেনকে সঙ্গে নিয়েই শহরের ২নং রেল গেটস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ফুল দেন আইভী। পরে তাঁরা একত্রে ঢাকা গণভবনে যান। বিগত ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আনোয়ার ও আইভী একত্রে থাকলেও ২০১৪ সালের ২৬শে জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনের পর আনোয়ার হোসেন চলে আসেন শামীম ওসমানদের বলয়ে।

এ ব্যাপারে জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল কাদির জানান, বিগত দিনে আমাদের রাজনীতিকে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রী আইভীকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছেন। এতে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। শুধু কারো ইচ্ছেয় না প্রকৃত নেতারাও এবার মূল্যায়িত হবে সেটাই প্রত্যাশা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই জানান, নির্বাচনে অনেক বিষয় স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। প্রকৃত নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা এখানে যাচাই করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে হয়তো এগুলোকেই প্রাধান্য দেয়া হবে। জেলার রাজনীতিতেও পরিবর্তন ঘটবে। এমজমিন

২৯ ডিসেম্বর,২০১৬/এমটিনিউজ২৪/এসবি

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে