শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০১৬, ০৪:৩০:১৬

নিউইয়র্কে বাঙালিময় ট্রাফিক পুলিশ

নিউইয়র্কে বাঙালিময় ট্রাফিক পুলিশ

হাসান ফেরদৌস: ম্যানহাটন বা কুইন্স, অথবা ব্রঙ্কস বা ব্রুকলিন নিউইয়র্কের যেকোনো এলাকার রাস্তায় হাঁটলেই নজরে পড়বে পুলিশের ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে, হাতে ছোট একটি মেশিন নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন বাঙালি ট্রাফিক কর্মী। তাঁদের চোখ বিভিন্ন গাড়ির ড্যাশ বোর্ডে, যেখানে নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য থাকে। তাঁদের আরেকটা চোখ পার্কিং মিটারের দিকে। পার্ক করা গাড়ি ঠিকমতো পার্কিং বিল দিয়েছে কি না, উদ্দেশ্য সেটা দেখা। বেআইনি কিছুর প্রমাণ মিললেই খসখস করে টিকিট লিখে দেবেন। জরিমানার পরিমাণ অপরাধের মাত্রার ওপর নির্ভর করে, তা ৩০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। নিউইয়র্ক পুলিশে এখন কমপক্ষে এক হাজার বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাঁদের অধিকাংশই ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন, যাঁদের পোশাকি নাম ‘ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট’।

এই শহরে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবল ২ হাজার ৬০০। অর্থাৎ শহরের ট্রাফিক পুলিশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। শুধু এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট নয়, পদোন্নতি পেয়ে অনেকে সুপারভাইজার হয়েছেন। কেউ কেউ পরীক্ষা দিয়ে ডিটেকটিভ হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছেন। তিন বছর আগে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে পুলিশ দপ্তরে বাঙালিদের এই হিসাবটা দেওয়া হয়েছিল। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় এক কোটি লোকের এই শহরে বাঙালির সংখ্যা লাখ খানেক হবে। ৫১ হাজার জনবলের পুলিশ দপ্তরে ৩৪ হাজার অফিসার, যাঁরা ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে সারা শহরে টহল দেন। শহরে বাংলাদেশিদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার বড়জোর ১ শতাংশ। অথচ ট্রাফিক পুলিশে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। ট্রাফিক এজেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি রবার্ট কাসসার পত্রিকাটিকে এই হিসাব দিয়েছিলেন।


নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, একসময় বাঙালি বলতে বোঝাত ট্যাক্সি ড্রাইভার, কিন্তু এখন তাঁদের প্রধান পরিচয় ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট। কিন্তু কী করে এত বাঙালি ঢুকলেন ট্রাফিক বিভাগে?
নিউইয়র্ক পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সুপারভাইজার খান শওকতের কাছে এর একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে। তিনি বললেন, ‘সরকারি চাকরির মধ্যে এই একটা কাজ মার্কিন নাগরিক না হলেও মেলে। আপনি যদি বৈধ অভিবাসী হোন, আপনার যদি গ্রিনকার্ড থাকে, আর ন্যূনতম হাইস্কুল পাসের সার্টিফিকেট থাকে, তাহলে চাকরির আবেদন করতে পারবেন।’ জ্যাকসন হাইটসের প্রিমিয়াম রেস্তোরাঁয়: ট্রাফিক পুলিশে বাঙালিদের ঠিকুজি খুঁজতে গিয়ে পরিচয় হলো খান শওকতের সঙ্গে। জ্যাকসন হাইটসের ‘প্রিমিয়াম’ রেস্তোরাঁয় তিনি বসেছেন তাঁর দুই বাংলাদেশি সহকর্মী নিয়ে। রাত সাড়ে আটটা হবে, লোকজন গিজগিজ করছে। হঠাৎ ঢুকলে মনে হবে ঢাকার কোনো জমজমাট রেস্তোরাঁ। এখানে কেউ এক কাপ চা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রাজা-উজির মারছে। কেউবা সপরিবারে এসেছে এক বেলা পেট পুরে দেশি খাবার খেতে। মাছ-ভাত তো রয়েছেই, শুঁটকি ভর্তা, কলিজা-গিলার লটপটি, এমনকি সাতকড়ার তরকারিও অনায়াসে মিলবে। চা-শিঙাড়া খেতে খেতে কথা হলো।


পুলিশ বিভাগে চাকরির এই রাস্তা বাঙালিদের দেখিয়েছেন খান শওকত। নিউইয়র্কে বাঙালিরা প্রথমে এসে ঠাওর করতে পারেন না, কোথায় গেলে একটা জুতসই চাকরি জুটবে। খান শওকত তাঁদের পথপ্রদর্শক। তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর কমিউনিটির দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। প্রতিবছর একাধিক জব সেমিনারের আয়োজন করেন তিনি। উদ্দেশ্য লোককে জানানো কীভাবে, কোন পথে এগোলে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি মিলবে। এ পর্যন্ত ৮৩টি সেমিনার করেছেন তিনি। রেস্তোরাঁতেই পরিচয় হলো ট্রাফিক এজেন্ট আশরাফুজ্জমানের সঙ্গে। ঢাকার খিলগাঁও থেকে ২০০২ সালে আমেরিকায় এসেছেন ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) পেয়ে। কিন্তু আমেরিকায় তাঁর জন্য চাকরি নিয়ে কে আর বসে আছে? ছোটখাটো কাজ জুটেছে, তাতে পরিবার নিয়ে স্বস্তির সঙ্গে বেঁচে থাকা অসম্ভব। একদিন খান শওকতের জব সেমিনারে হাজির হয়ে তিনি জানলেন, এ দেশে পুলিশের চাকরি পাওয়া তেমন শক্ত কিছু নয়। বেতনও ভদ্রগোছের, শুরুতেই সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার ডলার।


আশরাফুজ্জমান জানালেন, পরীক্ষা কঠিন কিছু নয়, মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাটা কিছুটা গোলমেলে। চার ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা, প্রায় দেড় হাজার প্রশ্ন। ঢাকার মিরপুর থেকে আসা আরেক ট্রাফিক এজেন্ট সিরাজুল ইসলাম জানালেন, শহরে হাজার হাজার গাড়ি, তাদের গতি যাতে ব্যাহত না হয়, অথবা কেউ যাতে ট্রাফিক আইন না ভাঙে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্রাফিক এজেন্টদের। কে বেআইনিভাবে গাড়ি পার্ক করেছে, কার পার্কিং মিটারে পয়সা ফুরিয়ে গেছে কিন্তু গাড়ি সরায়নি, কার নিবন্ধন নবায়ন হয়নি, তা পরীক্ষা করে ভুল পেলে তাৎক্ষণিক জরিমানা। সিরাজুল বলেন, ‘আমি নিজে অসংখ্যবার ট্রাফিক এজেন্টদের নজরদারির শিকার হয়েছি। এই শহরে লিগ্যাল পার্কিং পাওয়া খুব সহজ নয়, অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে অন্যায় জেনেও পার্কিং করেছি। হয়তো ৫-১০ মিনিটের জন্য কোথাও নেমেছি, এসে দেখি একখানা টিকিট ঝুলছে গাড়ির উইন্ডশিল্ডে।’জানতে চাইলাম, টিকিট দিতে গিয়ে কখনো বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়নি? তিনজনই বলে উঠলেন, অসংখ্যবার হতে হয়েছে। কেউ হাত ধরে অনুনয়-বিনয় করে, কেউ পকেটে টাকা গুঁজে দিতে চায়। কিন্তু একবার টিকিট লেখা হয়ে গেলে তা বদলানোর কোনো উপায় নেই।

খান শওকতের যেভাবে শুরু: খান শওকত নিউইয়র্ক পুলিশে চাকরি করছেন প্রায় ১৬ বছর ধরে। তিনি নিজে এই চাকরির খোঁজ পেয়েছেন এক অজ্ঞাতনামা আফ্রিকান-আমেরিকানের কাছ থেকে। না হলে তাঁকে আজও হয়তো ছোট দোকানে বা গায়ে খাটা কোনো কাজ করতে হতো। সেটা ২০০১ সালের কথা। তত দিনে নিউইয়র্কে ছয় বছর কেটে গেছে খান শওকতের। কিছুতেই ভালো কোনো কাজ জোটাতে পারছিলেন না। ছোটখাটো নানা ধরনের অস্থায়ী কাজ পেয়েছেন তা ঠিক, কিন্তু সেসবই কঠিন কায়িক শ্রমের। একদিন ম্যানহাটনে রেস্তোরাঁয় রাতভর কাজের শেষে খুব সকালে বাসে করে ঘরে ফিরছিলেন। বাসে তিনি একমাত্র যাত্রী, বাস ড্রাইভার এক আফ্রিকান-আমেরিকান। তখনো খুব ভালো ইংরেজি রপ্ত হয়নি, ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তুমি যে কাজ করছ, তেমন একটা কাজের খোঁজ কীভাবে পাওয়া যায়? সেই কৃষ্ণকায় ভদ্রলোক বললেন, ‘খুব সোজা। উইকলি দ্য চিফ পত্রিকা খুললেই দেখবে সেখানে বিস্তর সরকারি চাকরির খবর।’ ভদ্রলোক নিজে একটা নিউজ স্ট্যান্ডের সামনে গাড়ি থামিয়ে ২৫ সেন্ট দিয়ে একটি পত্রিকা কিনে এনে দিলেন। সেই পত্রিকা দেখে, নিয়মমাফিক পরীক্ষা দিয়ে, চাকরি পেয়েছিলেন খান শওকত।

প্রথম চাকরি ছিল সরকারি পরিবহন দপ্তরে, বাস সময়মতো স্টেশনে এসে পৌঁছাচ্ছে কি না, তার হিসাব রাখা। বছর চারেক পর নতুন করে পরীক্ষা দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের চাকরি নিলেন। এখন তাঁর পদোন্নতি হয়েছে, ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার থেকে সুপারভাইজার হয়েছেন। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে সারা বছর জব সেমিনার করে নিখরচায় নতুন অভিবাসী বাঙালিদের চাকরির সুযোগ করে দিচ্ছেন। শুধু পুলিশে নয়, নগর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যেসব চাকরি, বৈধভাবে এ দেশে বসবাস করে এমন যে কেউ সেই চাকরির আবেদন করতে পারেন। চাকরির খবর ছাড়াও ইংলিশে কথা বলা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।

জিরো টলারেন্স: জিজ্ঞেস করলাম, কোনো বাঙালিকে জরিমানা করার সময় কেমন লাগে? ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট সিরাজুল ইসলাম ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘আমরা জরিমানা করি আইন ভঙ্গের জন্য, কে কোন দেশের, কার গায়ের রং কী, তা আমরা দেখি না। কেউ হয়তো অনুনয়-বিনয় করে, হয়তো কোনো পরিচিত মানুষকেই টিকিট দিয়েছি, সে বন্ধুত্বের দোহাই দেয়। আমার এক কলিগকে একবার টিকিট দিতে হয়েছে। আমাদের এ নিয়ে কিছু করার থাকে না।’ একসময় ছাপানো বইতে টিকিট লিখতে হতো, এখন সব টিকিট লেখার ইলেকট্রনিক মেশিন রয়েছে। একবার লেখা শুরু হলে তা শেষ করতে হবে, বদলানোর কোনো উপায় নেই। ‘এ দেশে ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ নিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে আমাদের আইন হলো জিরো টলারেন্স।’ সিরাজুল বললেন। ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট আশরাফুজ্জামান জানালেন, একবার পপস্টার ম্যাডোনার গাড়িতে তিনি টিকিট দিয়েছিলেন। সে সময় ম্যাডোনা সেই গাড়িতে ছিলেন না। টিকিট দেওয়া হচ্ছে দেখে তাঁর ড্রাইভার কিছুটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ‘জানো এটা কার গাড়ি?’ আশরাফুজ্জামানের উত্তর, ‘গাড়ি যাঁরই হোক, আইন ভাঙার জন্য জরিমানা তাঁকে দিতে হবে।-প্রথম আলো

২৪ জুন, ২০১৬/এমটিনিউজ২৪/সবুজ/এসএ

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে