সোমবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২০, ১১:৫৪:১৭

দক্ষ ফুটবলার থেকে সুযোগ্য রাষ্ট্রনায়ক : এক নজরে এরদোগান

দক্ষ ফুটবলার থেকে সুযোগ্য রাষ্ট্রনায়ক : এক নজরে এরদোগান

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) : তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, ধার্মিক; তবে আধুনিক মনোভাবাপন্ন। ফুটবল ভালো খেলতেন। তুরস্কের মানুষ ফেনারবাহচে, গালাতেসারাই, ট্রাবজোন স্টোর্পট, কনিয়া স্টোরটস ইত্যাদি ক্লাবের জমজমাট খেলা দেখতে পাগল। 

বাড়িতে বাড়িতে উড়ে প্রিয় দলের পতাকা। দলের জার্সি বিক্রি হয় অজস্র। তুরস্কের বড় শহরগুলো যেমন ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, ট্রাবজোন, ইজমির, কনিয়া, দিয়ারবাকির, মার্সিন, এরজুরুম শহরগুলোতে রয়েছে সুদৃশ্য স্টেডিয়াম। তুরস্কের সড়ক-মহাসড়ক দারুণ সুন্দর, প্রশস্ত। জাতি হিসেবে তুর্কিরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করে। তার ছাপ পড়েছে বাজারে, দালানে, শপিংমলে; তাদের সরকারি দফতরগুলোতে।

তুরস্কের জুমহুরিয়াত হালক পার্টি আতাতুর্কের প্রতিষ্ঠিত দল। কট্টর পশ্চিমাঘেঁষা, সামরিক বাহিনী প্রাধান্য থাকা এ দলটি বহু বছর ক্ষমতায় ছিল। আর যে টার্মে তারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি, তখন তারা প্রধান বিরোধী দলে। তুরস্কের মতো ৯৯ শতাংশ মুসলিম সংখ্যাধিক্যের দেশে এরদোগান অনুভব করলেন এমন একটি দলের, যার স্লোগান হচ্ছে- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দেশের দ্রুত উন্নয়ন।

দলের নাম দিলেন একেপি; জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি। দল গঠনের প্রক্রিয়ায় তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। মানুষ তার কাজ পছন্দ করতে শুরু করে। একটি কবিতা আবৃত্তি নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তিনি জেলে যান। এর মধ্যে তার দল গঠন শেষ হয় এবং তিনি তার বন্ধু আবদুল্লা গুলকে সামনে রেখে সাধারণ নির্বাচনে চমক দেখান। আলদুল্লা গুল একেপি দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। একজন সজ্জন ও কর্মঠ মানুষ হিসেবে আবদুল্লা গুল পরিচিতি পান। 

প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি তার বন্ধু এরদোগানের বিচারটি আদালত মারফত শেষ করেন। এরদোগান মুক্ত হয়ে একটি উপনির্বাচনে জয়লাভ করেন। আবদুল্লা গুল প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন বন্ধুর কাছে। নিজে হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সে থেকে এরদোগান প্রথমে কয়েক দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম টার্মে তার উপরস্থ প্রেসিডেন্ট ছিলেন আহ্মেদ নেজদাত সেজার সিএইচপি; দলের সমর্থক প্রেসিডেন্ট। তার মেয়াদ ছিল ৭ বছর। পরবর্তীকালে আবদুল্লা গুল প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন।

এরদোগান অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে মনোনিবেশ করেন। একজন যুবককে বেছে নেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে; যার নাম আলী বাবাজান। আলী বাবাজান চমক দেখান। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থা এবং ইইউ'র সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য সম্প্রসারণ করে তুরস্কে তাক লাগানো উন্নয়ন সাধনে সবাই একযোগে কাজ করেন। তুরস্কের ভালো অবকাঠামো আরও বিকাশ লাভ করে এবং তা খুবই দ্রুত। আঙ্কারায় ছোট বিমানবন্দরটি দ্রুত বিশাল বন্দরে রূপ নেয়। 

শহর আঙ্কারা থেকে একটি এক্সপ্রেসওয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মিত হয়। সব শহরে বড় বড় শপিংমল উদ্বোধন হতে থাকে। ইস্তাম্বুলের এশিয়া অংশে সাবিহা গোকচেন বিমানবন্দর নির্মিত হয়। বসফরাস প্রণালীর ওপর দ্বিতীয় ঝুলন্ত সেতু নির্মিত হয়। বসফরাস প্রণালীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ কাজ শুরু করে নিজের মেয়াদেই এরদোগান তা খুলে দেন।

এসব প্রজেক্ট সবই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট এবং এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি এরদোগানবিরোধী এবং ইউরোপীয় ভাবধারার। এরদোগান সামরিক বাহিনীর তিরস্কার এবং বিরোধী দলের ক্রমাগত প্রচারণা- 'এরদোগান ইসলামপন্থী, আতাতুর্ক আদর্শবিরোধী' ইত্যাদি নীরবে সহ্য করেন। নির্বিকার এরদোগান তার দেশের উন্নয়নে একাগ্রচিত্তে কাজ করেন।

সামরিক বাহিনী এরদোগানের স্ত্রী ও পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ্ গুলের স্ত্রীর হিজাব পরিধান নিয়ে প্রকাশ্যে উষ্মা প্রকাশ করে। আতাতুর্কের 'চানকায়া প্যালেসে' হিজাব পরিহিত প্রেসিডেন্টের পত্নীরা গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রকাশ্যে প্রচারিত হতে থাকে। এরদোগান আঙ্কারায় নতুন প্রেসিডেন্ট ভবন তৈরি করেন; যা আয়তনে বিশাল। দৃষ্টিনন্দনও বটে। মসজিদসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আধুনিক করা হয়েছে। এভাবে আতাতুর্কের 'চানকায়া প্যালেস' সমস্যার সমাধান করেন এরদোগান। প্রেসিডেন্ট হয়ে এখন তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট ভবনে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে এরদোগান ইস্তাম্বুলে আতাতুর্ক বিমানবন্দর বৃহৎ আকারে নির্মাণ করেন; যা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিমানবন্দর।

ইসরাইল-জিসিসি দেশগুলোর নতুন সম্পর্ক বিষয়ে এরদোগানের অবস্থান : আল জাজিরা সংবাদ প্রচার করেছে- আরব-আমিরাত, বাহরাইনের সঙ্গে ইসরাইলের নতুন সম্পর্কে এরদোগান উষ্মা প্রকাশ করেছেন। পুরো মুসলিম উম্মাও এতে ক্ষিপ্ত হয়েছে। বাহরাইন ও আরব-আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কে মুসলিম বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। খোদ প্যালেস্টাইন এটাকে পৃষ্ঠদেশে ছুরিকাঘাত বলে উল্লেখ করেছে।

প্যালেস্টাইনের জন্য এটাকে রাজনৈতিক আত্মহত্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সুবিধা লাভের আশায় ট্রাম্প তার নেতৃত্বে ইসরাইল-মধ্যপ্রাচ্য কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে ফল লাভের আশায় বুক বেঁধেছিলেন। আমেরিকান ভোটাররা তাদের রায় দিয়েছে। অন্যদিকে এরদোগানের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্ব স্পষ্টই বিভক্ত হয়েছে।

এদিকে বাহরাইন ও আরব-আমিরাত ইসরাইল-তুরস্ক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করে এরদোগানকে দ্বিমুখী বলে দুষছেন। ইসরাইল-তুরস্ক প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য করে থাকে বছরে। প্রায় ৫ লাখ ইসরাইলি প্রতি বছর তুরস্কে বেড়াতে আসে। তুরস্ক ১৯৪৯ সালে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং দুই দেশে তাদের নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে। কাতার তুরস্কের অন্যতম সুরক্ষিত বন্ধু। আল জাজিরা অন্য অর্থে তুরস্কের রক্ষিত দেশ হিসেবে কাতারের নাম উল্লেখ করেছে।

তুরস্ক-আজারবাইজান সম্পর্ক : সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আর্মেনিয়া আজারবাইজানের ভেতরের ১টি অংশ- পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা নাগর্ন কারাবাখ নিজেদের জাতিগোষ্ঠীর (আর্মেনীয়দের) উত্থানের মাধ্যমে কব্জা করে। নাগর্ন কারাবাখ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা। বিশাল এলাকায় জনবসতি মোট ১,৫০,০০০ জন। তারা আর্মেনীয় বিধায় আর্মেনিয়ার শাসন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। 

১৯৯৪ সাল থেকে সবাই সচেষ্ট রয়েছে এ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আর্মেনীয়-তুর্কি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে। এতে আর্মেনীয়রা যেমন নিহত হয়, তেমনি তুর্কিরাও। তুরস্কের অনেক বইপুস্তকে ১৯২০ সালের দিকের সে ভয়াবহ যুদ্ধে তুরস্কের পুরুষদের নিহত হওয়ার সংখ্যা ও অঞ্চলের পর অঞ্চলে পুরুষবিহীন শুধু নারী, শিশু ও বৃদ্ধ ছাড়া কোনো এলাকা খুঁজে পাওয়া যেত না বলে উল্লেখ আছে।

বর্তমানে তুরস্ক সরকার, বিশেষত প্রেসিডেন্ট এরদোগান 'মুসলিম বিশ্বের ওপর যেখানেই অত্যাচার; সেখানেই প্রতিবাদ'-এর যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তাতে আজারবাইজানরা উজ্জীবিত হয়। তারা তাদের হারানো নাগর্ন কারাবাখ অঞ্চল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে। আজারবাইজান এতে কিছুটা সফলও হয়। বলা হয়, তুর্কি সেনা এবং পাকিস্তানি সেনারা এতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছে।

তবে আজারবাইজান নতুন অস্ত্র সম্ভার, বিশেষত ড্রোন ব্যবহারে কার্যকর ফল পাচ্ছে। মনুষ্যবিহীন ড্রোন রাডার নিয়ন্ত্রিত এবং আর্মেনীয় ট্যাঙ্ক ও কামানের ওপর নির্ভুল আক্রমণে দারুণ সফল। আর্মেনিয়া এখন যুদ্ধবিরতি চাইছে। তুরস্ক বলছে, তারা আগে দখলকৃত এলাকা ছেড়ে যাক। আজারবাইজানও চাচ্ছে এটাই। আর রাশিয়া এ কঠিন সময়ে তুরস্ককে চটাতে চায় না। কেননা, ন্যাটোবিরোধী রাশিয়া চাচ্ছে তুরস্ক ন্যাটো ত্যাগ করুক। আর ইরান তো পাশে আছেই। 

এতে পারস্য সাগরের পূর্বদিকের সব দেশ একদিকে এবং পশ্চিমদিকের সব দেশ (কাতার ছাড়া) আমেরিকা-ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। রাশিয়ারও মাথাব্যথা রয়েছে ইউক্রেন নিয়ে। সিরিয়া, লিবিয়া আর ক্রিমিয়া তো রয়েছেই; তার ওপর তুরস্কের বিরোধিতা করে আর্মেনিয়ায় কিছু করার ক্ষেত্রে পুতিন মোটেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। মধ্যপ্রাচ্যে এখন তুরস্ক শুধু শক্তিধর দেশ নয়, আঞ্চলিক নেতাও বটে। 

তুরস্কের এ উত্থানে অনেকে তুরস্কের ওসমানী খেলাফতের নবজাগরণ বলে টিপ্পনি কাটেন। তবে তুরস্ককে একঘরে করতে ইসরাইল সচেষ্ট। ট্রাম্পকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহদের সিংহাসন অটুট রাখার কথা দিয়ে জিসিসি দেশগুলোসহ (কাতার ছাড়া) মিসর ও জর্ডানকে নিয়ে চেষ্টা করতে থাকে একটি বলয় তৈরি করতে। এরই মধ্যে যদি ওআইসি ভেঙে যায়, তাহলে সৌদি আরব পড়বে বিপদে। কেননা, মুসলিম বিশ্বের নেতার দাবিদার তখন হবেন দু'জন; সৌদি শাসক আর তুরস্কের শাসক।

এরই মধ্যে ইসরাইল প্রতিনিয়ত প্যালেস্টাইনের ভূমি দখল করে গড়ে তুলছে নতুন আবাসস্থল। প্রিয় পাঠক, যদি আপনারা ১৯৪৮ ও ১৯৭৩ সালের ইসরাইল-প্যালেস্টাইন মানচিত্র দেখার পর বর্তমানটা দেখেন, তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। বৃহৎ প্যালেস্টাইন এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে অতি ক্ষুদ্র। আর ছোট ইসরাইল এখন ৮৫ শতাংশ ভূমির অধিকারী। মুসলিম নেতৃত্বের ঝামেলায় প্যালেস্টাইনকে প্রায় ভুলেই যেতে বসেছে মুসলিম উম্মা। 

দীর্ঘ ৬ সপ্তাহের যুদ্ধের পর রাশিয়ার মধ্যস্থতায় আর্মেনিয়া-আজারবাইজান একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। চুক্তিটির বড় প্রয়োজন ছিল রাশিয়া ও তুরস্কের। কেননা, এ দুই শক্তি দুটি পক্ষকে এমনভাবে সাহায্য করছিল- উভয়েরই একপর্যায়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়াটা অসম্ভব ছিল না। চুক্তির বিশেষ দিক হল, নাগর্ন কারাবাখ থেকে আর্মেনিয়ার সব সৈন্য প্রত্যাহার এবং তদস্থলে রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনীর পদায়ন, যা এখন কার্যকর করা হয়েছে। 

১৯৯০ সালে এখানে ৩০ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুহারা হয়েছিল। এখন আজারবাইজান তাদের হারানো বেশকিছু অঞ্চল ফেরত পেল এবং বাস্তুহারা আজারি মুসলিমরা তাদের ভিটায় ফিরতে পারবেন। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, নিজে দেশের খাতিরে তিনি খুবই কষ্টকর ও দুরূহ সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেছেন। কেননা, আজরি সৈন্যবাহিনী নাগর্ন কারাবাখের রাজধানী শহরের দুই কিলোমিটার দূরে চলে এসেছিল। 

আর্মেনিয়া স্বীকার করেছে- তার সৈন্য, রসদ ও যুদ্ধসামগ্রী অসম ও শেষ অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে। সেজন্য দেশ ও মানুষ বাঁচাতে আর্মেনিয়া এ চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। আর বাকুতে চলছে আনন্দ উৎসব। আজারবাইজানের রাজধানী এখন তুরস্ক আর আজারবাইজানের পতাকায় সুশোভিত। এরই মধ্যে তুরস্ক রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে তুর্কি শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। তুরস্ক এখন আর অতীতের মতো ক্ষতির সম্মুখীন হতে চায় না।

গ্রিস-তুরস্ক : বৈরী সম্পর্ক বহুদিনের পুরনো এবং তা ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাস নিয়ে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তুর্কি সাইপ্রাস অবশ্য ক্রমাগত তুরস্ক থেকে ইইউতে ধাবমান হচ্ছে। যদিও এবার তুর্কি সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগান তার পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করে আনতে পেরেছেন। তা তার জন্য এক বিশাল বিজয়। না হলে বিরোধী প্রার্থী গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনসহ ইইউতে চলে যাওয়ার প্রকাশ্য ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিল। 

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলন নিয়ে তুরস্ক আর গ্রিস প্রায় যুদ্ধের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ফ্রান্স গ্রিসকে এমনভাবে সাহায্য করছিল; যার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। ধন্যবাদ প্রাপ্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের। তিনি তথ্য-উপাত্ত নিয়ে, সার্ভে ফলাফল প্রদর্শন করে তুর্কি সাইপ্রাস ও তুরস্ক সমুদ্রসীমায় গ্যাস ফিল্ডের মজুদ আলোচনার টেবিলে প্রমাণে সচেষ্ট হন। তুরস্ক তাদের জলসীমায় নৌ মহড়া করেছে। গ্রিস ও তার মিত্র ফ্রান্স বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে শক্তি প্রদর্শন করেছে। 

তুরস্ক আশাবাদী, কারণ ন্যাটোর বড় শক্তি তুরস্ক। বিগত দিনগুলোয় ইইউ ও গ্রিস গ্রিক সাইপ্রাসকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছিল। তবে তুরস্ক অনড়। নিজস্ব জলসীমায় তেল-গ্যাস উত্তোলনে তাকে বাধা দেয়ার কে? তুর্কি সাইপ্রাসের অনুমতিপ্রাপ্ত তুরস্ক গ্যাস-তেল উত্তোলন করবে- এ বাস্তবতা এখন দৃশ্যমান। এতে চীন-রাশিয়া তুরস্ককে সমর্থন দেবে বলেই মনে হয়। তবে আমেরিকা এতে কোন পক্ষে অবস্থান নেবে; সেটা আগামী আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

'হাজিয়া সোফিয়া' বা 'আয়া সোফিয়া' স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন। এটি বাইজানস্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত একটি গির্জা; যা মুসলিম শাসক সুলতান মেহমেদ-২-এর অভিযানকালে ১৪৫৩ সালে দখল হয়। পরবর্তীকালে ওসমানী খেলাফতের সময় আয়া সোফিয়ার চারটি মিনার স্থাপিত হয় এবং এটি সংস্কার করে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। আয়া সোফিয়া প্রতিষ্ঠিত হয় ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে।

পরবর্তীকালে এটি মসজিদ হিসেবে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত চলছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের খাতিরে আতাতুর্ক ১৯৩৫ সালে মসজিদ বন্ধ করে তা মিউজিয়ামে রূপান্তর করেন। এরদোয়ান ঐতিহাসিক সব দলিল উপস্থাপন করে ১৬ বছর মামলা পরিচালনার পর আয়া সোফিয়া পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত হয়। তবে আয়া সোফিয়া এখনও পর্যটকদের জন্য খোলা আছে এবং ইমারতটি তার পুরনো ঐতিহ্য বহন করছে। 

গত জুলাই মাসে কোর্টের আদেশ প্রাপ্তির পর এরদোয়ান তার ধর্মমন্ত্রীর ইমামতিত্বে এখানে প্রথম নামাজ আদায় করেন। এর মধ্য দিয়ে পুরনো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে বলে অধিকাংশ তুর্কি মত প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন অবশ্য এটা বলেছে- তুরস্ক এখন 'উসমানী খেলাফতের' আদর্শে উজ্জীবিত একটি দেশ। সীমানার বাইরেও ক্ষমতা প্রদর্শনে তারা সাহস দেখাচ্ছে।

এরদোয়ান মাঠে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন; রাজনীতিতে ভালোই করছেন। ইইউ, আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। সবচেয়ে মূল বিষয়- এরদোয়ান যে কোনো বড় পলিসি বিষয়ে দেশে প্রথমে জনমত সৃষ্টি করেন; পরে তা আলোচনা-সমালোচনার পর কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এতদিন এটি ভালোই ফল দিয়েছে। দেখা যাক, পরবর্তী খেলায় তিনি বিজয়ী হন কিনা? লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) : তুরস্কে দায়িত্বপালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাশে।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে