আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই। বাড়িতে খাবার নেই। শিশুখাদ্য আগেই শেষ। দোকান ফাঁকা, ব্যাংকও খালি। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যৎসামান্য যা পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম আকাশছোঁয়া। স্থানীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতি। ভাঙছে ধৈর্যের বাঁধ। ছড়াচ্ছে বিক্ষোভ, উত্তেজনা। বাড়ছে সহিংসতা, জ্বলছে আগুন। ভয়াবহ সংকটে জর্জরিত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার বর্তমান চিত্র এখন এমনই।
শ্রীলঙ্কা স্মরণকালের ভয়াবহতম আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের রোষ স্বাভাবিকভাবেই পড়েছে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যদের ওপর। গত কয়েক দশক ধরে দেশটির শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন শীর্ষপদে এই পরিবারের মোট ৫ জন সদস্য রয়েছেন এবং শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসলে তাদেরই হাতে।
বিক্ষুব্ধ জনতা রাষ্ট্রপতির বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখায়। যার ফলে রাষ্ট্রপতির বাড়ির সামনে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঘটনাকে ইন্টেলিজেন্স ফেলিওর হিসাবেও সেদেশের সরকার ব্যাখ্যা করেছে। কারণ এই বিক্ষোভ যে এত বড় হবে তা আঁচ করা যায়নি। বিশেষ করে সেইসময় বাসভবনে স্বয়ং রাজাপাকসে ও তার পরিবারের সদস্যরা ছিলেন।
শ্রীলঙ্কা জুড়ে রাজাপাকসেকে সরিয়ে দিতেই যে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হচ্ছে তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতেই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। যার ফলে বিক্ষোভকারী বা সন্দেহভাজনদের কোনওরকম ট্রায়াল ছাড়াই দিনের পর দিন গ্রেপ্তার করে বন্দি রাখা যাবে। শ্রীলঙ্কার রাস্তায় রাস্তায় রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। শ্রীলঙ্কার পশ্চিম, উত্তর, মধ্য, দক্ষিণ - প্রায় সবকটি প্রদেশেই রাজাপক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। নিজের গদি বাঁচাতে, রাজাপক্ষে শ্রীলঙ্কায় এবার জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।
বার্তাসংস্থা এএফপি রাজাপাকসে পরিবারের ৫ প্রভাবশালী সদস্যের একটি সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল তৈরি করেছে। এ সদস্যরা হলেন শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, তার তিন ভাই গোতাবায়া (রাষ্ট্রপতি), বাসিল ও চামাল রাজাপাকসে এবং মাহিন্দা রাজাপাকসের বড় ছেলে নামাল রাজাপাকসে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসলে এদেরই হাতে।
মাহিন্দা রাজাপাকসে : রাজাপাকসে পরিবারের ক্যারিশম্যাটিক প্রধান বলে মনে করা হয় শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেকে। ৭৬ বছর বয়সী মাহিন্দা প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০০৪ সালে। তারপর ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনহালা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে বেশ জনপ্রিয়; আর তার এই জনপ্রিয়তার মূল কারণ ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহীদের দমন। তবে তিনি নৃশংস সামরিক পন্থায় এ কাজ করেছিলেন।
মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বেশি ঘনিষ্ট হয়েছে শ্রীলঙ্কার। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময়ে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার ঋণও নিয়েছেন মাহিন্দা, তবে তার প্রায় সব উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি ঘটেছে। পাশাপাশি, তামিল বিদ্রোহীদের দমন করলেও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও তামিল ভাষাভাষি গোষ্ঠীর মধ্যকার বৈরিতা অবসানে তিনি তেমন কোনো ভূমিকা নেননি।
গোতাবায়া রাজাপাকসে : মাহিন্দার ছোটভাই ও শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে তার পরিবারের সদস্যরাই ডাকেন 'দ্য টার্মিনেটর' বা 'বিধ্বংসী' নামে। খুব দ্রুত মেজাজ হারান বলে প্রতিপক্ষের লোকজনও ভয় পান ৭২ বছর বয়সী গোতাবায়াকে। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মাহিন্দার প্রধান সহচর বা লেফটেন্যান্ট ছিলেন গোতাবায়া রাজাপাকসে। দেশটির সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব গোতাবায়া তার প্রশাসনিক পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দিনের পর দিন ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করেছেন শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর। গোতাবায়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ , প্রতিপক্ষের লোকজনকে গুম করে ফেলার জন্য 'ডেথ স্কোয়াড' গঠন করেছিলেন তিনি।
বাসিল রাজাপাকসে : মাহিন্দা ও গোতাবায়া রাজাপাকসের ছোটোভাই এবং দেশটির বর্তমান অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি চুক্তি থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবং এ কারণে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে তিনি মি. টেন পার্সেন্ট নামেও পরিচিত। এছাড়া আরও অভিযোগ দেশের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংকে লাখ লাখ ডলার পাচারের করেছেন বাসিল। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কয়েক দফা তদন্তও হয়েছে, কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়।
চামাল রাজাপাকসে : রাজাপাকসে ভাইদের মধ্যে বয়সে সবার চেয়ে বড় চামাল রাজাপাকসে। পরিবারের দলনেতা মাহিন্দা রাজাপাকসের চেয়ে তিন বছরের বড় তিনি। মাহিন্দা যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সে সময় শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন চামাল। এছাড়া শ্রীলঙ্কার সাবেক জাহাজ পরিচালনা ও বিমান পরিবহন পরিষেবা মন্ত্রীর পদেও ছিলেন তিনি। বর্তমানে যদিও সরকারের সেচ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তিনি কিন্তু তার মূল প্রভাব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে। গোতাবায়ার পর ওই মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হয় চামালকে।
নামাল রাজাপাকসে : মাহিন্দার বড় ছেলে নামাল রাজাপাকসেকে এই পরিবারের প্রধান উত্তরসূরী হিসেবে মনে করা হয়। ৩৫ বছর বয়সী নামাল পেশায় একজন আইনজীবী। ২০১০ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে জনপ্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টে জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রবেশ করেন তিনি এবং কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে না থাকলেও বাবার প্রেসিডেন্টের পদের প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে ব্যাপক প্রভাবশালী করে তোলেন নামাল। বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী তিনি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগ থাকলেও তাকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৈরি করছেন মাহিন্দা রাজাপাকসে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পরই এই প্রথম চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। ২.২ কোটি জনসংখ্যার দেশে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চরম সঙ্কট দেখা গিয়েছে। হু হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম। ইতিমধ্যেই ডিজেলের ভাণ্ডার শেষ হয়ে গিয়েছে, শেষের পথে পেট্রোলও। চরম বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে দিনের প্রায় ১০ ঘণ্টাই লোডশেডিং করে রাখা হচ্ছে। শুক্রবার রাত থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে কার্ফু জারি করা হয়েছে।