এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : গ্রীষ্মের কাঠফাঁটা গরমে মানুষের স্বস্তির নাম এখন তরমুজ। রসালো এই ফলে এখন রাজধানীর বাজার ভরপুর। ফলে বেচাকেনাও জমে উঠেছে বেশ। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবার শুধু কেজি দরে নয়, বেশিরভাগ জায়গাতেই পিস হিসেবেই বিক্রি হচ্ছে তরমুজ। এতে খুশি ক্রেতারা, স্বস্তিতে বিক্রেতারাও।
সরজমিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, আড়তগুলোতে থরে থরে সাজানো তরমুজ। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরমুজে ভরে উঠেছে পুরো আড়ত এলাকা। খুচরা বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন আড়ত থেকে তরমুজ কিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। ক্রেতা ও পাইকারদের ভিড়ে সেখানে বেচাকেনাও বেশ চাঙা।
আড়তদাররা জানান, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও খুলনা অঞ্চল থেকে এবার বিপুল পরিমাণ তরমুজ রাজধানীর বাজারে আসছে। তবে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলার তরমুজ মৌসুম প্রায় শেষের দিকে থাকায় এখন খুলনার বিভিন্ন জেলা থেকেই বেশি সরবরাহ আসছে।
আড়তদার সবুজ মোল্লা বলেন, এবার বাজারে তরমুজের সরবরাহ অনেক ভালো। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে ট্রাকে তরমুজ আসছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ থাকায় দামও তুলনামূলক কম রয়েছে। আড়তে এখন প্রতি কেজি তরমুজ ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে খুচরা বাজারেও তরমুজের বেচাকেনা বেশ জমজমাট। রাজধানীর অলিতে-গলিতে ভ্যানে ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে রসালো তরমুজ। ক্রেতারা বলছেন, এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় দামে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে এবং সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো; শুধু কেজি নয়, বেশিরভাগ জায়গাতেই এবার পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে।
সামাদ নামের এক ক্রেতা বলেন, আগে কেজি দরে তরমুজ কিনতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হতো; কারণ দাম অনেক বেশি থাকত। তবে এবার পিস হিসেবে কিনতে পারছি, তাই দামও মোটামুটি নাগালের মধ্যেই রয়েছে।
বিক্রেতারা জানান, বাজারে এবার তরমুজের সরবরাহ বেশি থাকায় দামও কমেছে তুলনামূলকভাবে। এতে বিক্রিও ভালো হচ্ছে। ভ্যানে তরমুজ বিক্রি করা ফাহিম বলেন, এবার গ্রামাঞ্চল থেকে প্রচুর তরমুজ আসছে। তাই আমরা পিস হিসেবেই বিক্রি করছি। এতে ক্রেতারাও খুশি, আমরাও দ্রুত বিক্রি করতে পারছি।
আরেক তরমুজ বিক্রেতা সজল বলেন, ছোট তরমুজ এবার সব পিস হিসেবেই বিক্রি হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী হয়ত কেজি দরে বিক্রি করে থাকতে পারেন। তবে বড় সাইজের ১০ থেকে ১৪ কেজি ওজনের তরমুজগুলো কেজি দরেই বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাজারে এত তরমুজ কোথা কোথা এলো জানতে কথা হয় দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষি, আড়তদার ও পাইকারদের সঙ্গে। কৃষকরা জানান, চলতি বছর শীত দীর্ঘস্থায়ী ছিল না, কুয়াশাও ছিল তুলনামূলক কম। ফলে গাছে রোগের প্রকোপ কমেছে, ফলন এসেছে সময়মতো।
খুলনার দাকোপ উপজেলার কৃষক মো. সোহেল রানা বলেন, ৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। মোট খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিক্রি করেছি প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার টাকায়। খুব বেশি লাভ না হলেও লোকসান হয়নি।
একই উপজেলার আরেক কৃষক আব্দুল করিম জানান, বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এবার গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পেরেছি। এতে বিঘা প্রতি ২৫-৩০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় দাম ভালো, তবে আগের বছরের মতো বেশি না।
পাইকগাছা উপজেলার কৃষক শাহিন আলম বলেন, এলাকায় প্রায় সব তরমুজই তুলে ফেলা হয়েছে। বাজার ভালো থাকায় দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে। দাম মোটামুটি ভালো পাওয়ায় ক্ষতি হয়নি।
মূলত খুলনা অঞ্চলের, বিশেষ করে দাকোপের তরমুজ লাল রং ও মিষ্টি স্বাদের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে খুলনা জেলায় ১৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৮ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে দাকোপ উপজেলায়, ৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। জাতীয় উৎপাদনের দিক থেকেও খুলনা জেলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই এখানকার তরমুজ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ শুরু হয়েছে। ক্ষেত থেকেই ব্যাপারীরা ট্রাকে করে তরমুজ পাঠাচ্ছেন রাজধানীর কাওরান বাজারে। এছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও কুমিল্লাতেও রয়েছে বড় বাজার।
এরই মধ্যে পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার অধিকাংশ জমির তরমুজ উত্তোলন শেষ হয়েছে। তবে দাকোপ উপজেলায় এখনও প্রায় ৬০ শতাংশ জমির তরমুজ মাঠে রয়েছে, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ হার্ভেস্ট সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে খুলনায় খুচরা বাজারে বড় আকারের তরমুজ কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। পাইকারি পর্যায়েও ভালো দর পাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খুলনার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি না হওয়ায় গুণগত মানও ভালো রয়েছে। কৃষকরা ক্ষেত থেকেই ভালো দাম পাচ্ছেন, এতে তারা সন্তুষ্ট। বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, আর বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। গড়ে বিঘা প্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ করছেন কৃষকরা, অনেক ক্ষেত্রে এই লাভ আরও বেশি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, আগামী এক মাস পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলের তরমুজ ক্ষেত থেকে বাজারে সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। উৎপাদন কিছুটা কম হলেও ভালো দামে বিক্রি হওয়ায় মৌসুম শেষে কৃষকদের আয় সন্তোষজনক হবে।
অন্যদিকে, বরিশাল বালুঘাটের আড়তদার সাইফ ফল ভাণ্ডারের মালিক ইব্রাহিম জানান, চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় আড়াই লাখ পিস তরমুজ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বিভাগের মাঠে তরমুজের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। ফলে এখন আড়তগুলোতে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে তরমুজ আসছে।
রাহাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. রুবেল হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। তবে মূল সমস্যা ছিল দাম না পাওয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বরিশালে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে মোট উৎপাদন হয়েছে ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন। গড় হিসেবে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩৮ মেট্রিকটন।
বরিশাল নগরীর লঞ্চঘাট এলাকার বালুঘাট, মাছঘাট ও কলাপট্টি মিলিয়ে মোট ৯৬টি তরমুজের আড়ত রয়েছে। বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে চাষিরা এসব আড়তেই তরমুজ নিয়ে আসেন। আড়তদার সমিতির হিসাবে, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত এসব আড়ত থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ পিস তরমুজ বিক্রি হয়েছে।
এখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১৮টি জেলায় পাইকারি দরে তরমুজ সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে ১০ থেকে ১৪ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ৭ থেকে ১০ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজের দাম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। আর ৩ থেকে ৬ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়।