দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। এক দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সঙ্কট ও জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব, অন্য দিকে দেশে এলসি খোলার জটিলতাসহ সবমিলিয়ে এলপিজির আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে ভয়াবহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়ও মিলছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আবার মাটির চুলা, কেরোসিন স্টোভ বা বৈদ্যুতিক চুলায় ফিরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জানুয়ারিতে অন্তত দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি করে ফেব্রুয়ারিতে বাজারে পৌঁছানো জরুরি। সময়মতো এই পরিমাণ আমদানি না হলে রোজার মাসে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৬ লাখ ১০ হাজার টনে উঠলেও ২০২৫ সালে আমদানি নেমে আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। বিশেষ করে বছরের শেষ তিন মাসে আমদানির পতন সবচেয়ে বেশি, যা সরাসরি বাজারে সঙ্কট তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা যেখানে প্রতি বছর ১০ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে, সেখানে আমদানি কমে যাওয়া বাজারকে কার্যত অচল করে দেয়। বিইআরসি বলছে, দেশে লাইসেন্সধারী ৫২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩টির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও গত বছর নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠান। বড় কয়েকটি কোম্পানি এলসি জটিলতার কারণে আমদানি বন্ধ রাখায় সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঙ্কটের মূল কারণ এলসি খোলার জটিলতা এবং ইরান থেকে আসা এলপিজিবাহী জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। চট্টগ্রামের একাধিক আমদানিকারক জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো এলসি খুলতে পারেনি। ফলে আমদানি চেইনে বড় ছেদ পড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও এলপিজি ব্যবসায়ী মাহফুজুল হক বলেন, তাদের এলপিজির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় কয়েকটি জাহাজ আটকে যাওয়ায় বাংলাদেশমুখী সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এলসি খোলা থাকলেও জাহাজ সঙ্কটে সময়মতো পণ্য আনা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আগে ইরান থেকে একটি বেসরকারি চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য এলপিজি আসত, সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে হঠাৎ বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এ দিকে বাস্তবে ভোক্তাদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালে সিলিন্ডার মিলছে না দিনের পর দিন। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আক্তার জানান, এক হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে দুই হাজার ৩০০ টাকায়। মিরপুর, রূপনগরের আরাফাতুল ইসলাম ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনেছেন দুই হাজার ৭০০ টাকায়। রাজধানির অনেক পরিবার গ্যাস না পেয়ে নতুন করে কেরোসিন স্টোভ কিনছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ দিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় ৭০ শতাংশ সিলিন্ডার এখন খালি। যেটুকু আসে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। সরবরাহ না থাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও মেসগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বলে তিনি জানান।
সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়, যার প্রায় ১৫ হাজার টন যায় অটোগ্যাসে। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় দেশের প্রায় সব অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। এতে প্রায় দেড় লাখ এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিক বিপাকে পড়েছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি সেরাজুল মাওলা বলেছেন, মোট ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ অটোগ্যাস খাতে নিশ্চিত না করলে পুরো খাত ধসে পড়বে এবং মালিকরা আবার পেট্রোল-অকটেনে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন, যা পরিবেশ ও জ্বালানি ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলছেন, সরকারি দাম ১,৩০০ টাকা হলে ভোক্তা কেন ২,৫০০ টাকা দেবে। তিনি এলপিজিকে অত্যাবশ্যক পণ্য ঘোষণা ও স্বচ্ছ মূল্যকাঠামো নিশ্চিতের দাবি জানান।
এ দিকে বিইআরসি স্বীকার করেছে, খুচরা পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন। কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, শীতকালে চাহিদা বাড়ে, জাহাজ সঙ্কটও আছে। তবে এসব সমস্যা সাময়িক। অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বাজারে কয়েকটি বড় কোম্পানির আধিপত্য থাকায় ছোট অপারেটররা টিকতে পারছে না। জেএমআই চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক সতর্ক করে বলেছেন, ২৭ অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটির আমদানির সক্ষমতা রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা চললে পুরো বাজার অস্থির হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঙ্কট শুধু আমদানির নয়, নীতিগত সমন্বয়হীনতারও। অধ্যাপক এম তামিম বলছেন, এলপিজি খাতে একক ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। বর্তমানে লাইসেন্স, আমদানি অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ সবখানে বহুমুখী সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া কাজ করছে, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া নেয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা দফতর থেকে বলা হচ্ছে, এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং আমদানি অনুমতি বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি উপদেষ্টা ফৌজুল কবির খান জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে জি-টু-জি ভিত্তিতে সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ২০ লাখ টন, যা অদূর ভবিষ্যতে সাড়ে ৩৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এমন দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে পরিকল্পনাহীনতা যে কতটা বিপজ্জনক, বর্তমান সঙ্কট তার বড় উদাহরণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান সামনে রেখে দেড় লাখ টন জরুরি আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। ভোক্তাপর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, এলসি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, জাহাজ সঙ্কটে বিকল্প রুট খোঁজা এবং অটোগ্যাস খাতে ন্যূনতম বরাদ্দ নিশ্চিত এই চারটি পদক্ষেপ এখন সবচেয়ে জরুরি বলে তারা মনে করছেন। এলপিজি খাতের এই অস্থিরতা শুধু রান্নাঘর নয়, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাকেই বড় ঝুঁকিতে ফেলবে, যার মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে এমনটাই মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।