এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জোরেশোরে আলোচনায় রাষ্ট্রপতি পদ। রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে সরকারি দলের গণ্ডি পেরিয়ে বিরোধী দল- এমনকি জনমনেও নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে- মো. সাহাবুদ্দিন আর কতদিন থাকছেন রাষ্ট্রপতি পদে। তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন নাকি তাকে ইমপিচমেন্ট (অভিশংসন) করা হবে। এদিকে বর্তমান বিএনপি সরকারের একাধিক সিনিয়র নেতা এ পদে আলোচনায় রয়েছেন।
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ-সদস্যদের মতামত লাগবে। ২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ইমপিচমেন্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন।
তবে ওই ঘটনা বিএনপি সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর হয়েছিল বলে এখনো অনেকে মনে করেন। ফলে আপাতত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ইমপিচমেন্ট করতে রাজি নয় বিএনপি। তবে সরকারি দল চাইলে রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন এমন আলোচনা আছে সরকারি দলের মধ্যে।
সূত্র জানায়, অনেক কারণে রাষ্ট্রপতি পদে নতুন সিদ্ধান্তের জন্য সময় নিচ্ছে বিএনপি। প্রথমত দলটি এখনই কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে রাজি নয়। দ্বিতীয়ত এ প্রশ্নে জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির হিসাব-নিকাশের বিষয় রয়েছে। তৃতীয়ত সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি রাষ্ট্রপতিকে তাদের দাবি ও চাপের মুখে সরাতে চায়। ফলে বিএনপি এখনই এ প্রশ্নে তাদের দাবি না মেনে কৌশলী অবস্থান গ্রহণের পক্ষে। সর্বশেষ হিসাব হলো- এখন একজন নতুন রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ করা হলে বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই রাষ্ট্রপতিরও ৫ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অথচ এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ফলে এসব বিষয় বিএনপিকে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
অন্তত ছয় মাস পর রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হলে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিই বহাল থাকবেন এমন একটি আলোচনা আছে দেশের রাজনীতিতে। ফলে সবকিছুর হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি।
তবে দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন নেতাকে বসানোর সম্ভাবনাই বেশি। ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন এবং তিনি নিজেই সভাপতি হিসাবে ড. মোশাররফের নাম প্রস্তাব করেছেন। তবে এই নেতা এখন কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা দেরি হতে পারে। একটি সূত্রের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভব না হলেও তাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একটি সূত্রের দাবি, অন্তত সরকারি প্রটোকলের আওতায় আনার জন্য মন্ত্রী পদমর্যাদায় তাকে কোনো পদ দেওয়া হতে পারে। একইভাবে বিএনপির আরেক প্রবীণ নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকেও মন্ত্রী সমমর্যাদার কোনো পদ দিয়ে সম্মানিত করা হতে পারে। সংসদের স্পিকার পদে ড. মঈন খানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার হিসাবে বেছে নেন তারেক রহমান। একইভাবে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে ড. মোশাররফের নাম। তবে ওই পদেও কোনো চমক আছে কিনা সেটি প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কারও জানা নেই।
কারণ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে আলোচনায় আছে। কেউ কেউ বলছেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। দলটির স্থায়ী কমিটির এই নেতাকেও এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে সবকিছু নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরে। অনেকের মতে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রধানমন্ত্রী এক ধরনের চমক দেখিয়েছেন। কারণ যে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা খুব বেশি আলোচনায় ছিলেন না।
বিএনপির সিনিয়র অন্তত দুজন নেতা বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে যে দুই নেতাকে নির্বাচন করা হয়েছে তারা কিন্তু আলোচনায় ছিলেন না। বরং ওই দুজনই মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এই দুই পদে অনেকটা চমক দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই রাষ্ট্রপতি পদেও এমন চমক থাকতেই পারে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মন্ত্রী হওয়ার আলোচনায় ছিলেন এমন অধিকাংশ বিএনপি ও শরিক দলের নেতা ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর আলোচনায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগ করা হয় উপদেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে দেখা যায়, বিএনপির প্রবীণ ও গুরুত্বপূর্ণ তিন নেতা ড. খন্দকার মোশররফ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. মঈন খান সরকারের বাইরে আছেন। ফলে তাদের কোথায় রাখা হবে, সে আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপির পাশাপাশি অন্য দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় এখন রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। আর জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার পদে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লা-১ ও ২ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দল তাকে রাষ্ট্রপতির সম্মানজনক পদ তারই প্রাপ্য বলে বলে ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে আলোচনা আছে। অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে মোট চারবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। আর ঢাকা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর। সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পান। তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। যদিও ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আন্দোলন করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে অপসারণ কিংবা তার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি।
তবে ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ‘অপমানিত বোধ করছেন’। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সরে যেতে চাই, আমি সরে যেতে আগ্রহী। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’