এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : প্রায় ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে তা আংশিক ও ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি অংশ এবং বিভিন্ন ভাতা পরবর্তী দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী নবম পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর, দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): বাকি ৫০ শতাংশ বেসিক প্রদান, তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): সব ধরনের ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
বেতন কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের মূল হিসাব অনুযায়ী পূর্ণ পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। তবে বর্তমানে কার্যকর ১০ শতাংশ মহার্ঘভাতা সমন্বয় করায় ব্যয় কমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান এর নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন বেতন কাঠামোতে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রাখা, বিভিন্ন স্তরে উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধি।
তবে পরে গঠিত সচিব কমিটি এসব সুপারিশের বড় অংশ কাটছাঁট করে। বিশেষ করে কুক, মালি, গাড়ি সংক্রান্ত ভাতা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিছু সুবিধা অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী মোট বাস্তবায়ন ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও তা কমিয়ে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে পেনশন ও বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ২০ হাজার টাকার কম পেনশনে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি ও ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা ও ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১ম গ্রেড: ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ২০তম গ্রেড: ২০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রেডে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২য় গ্রেডে বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেতন কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সবশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রায় এক যুগ পর নতুন পে-স্কেল কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্মূল্যায়নের কারণে কমিশনের পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে আংশিক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতন কমিশনের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন মুহাম্মদ ইউনূস এর কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন তৈরিতে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জীবনমান বিবেচনায় রেখেই কমিশন নতুন কাঠামোর সুপারিশ তৈরি করে।