বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৬:১৭

হঠাৎ কেন এই লোডশেডিং? জানা গেল আসল কারণ

হঠাৎ কেন এই লোডশেডিং? জানা গেল আসল কারণ

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : তীব্র গরমের মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সারা দেশে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ থাকছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বিবিসি বাংলা

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, সকাল, দুপুর কিংবা রাত বিদ্যুৎ যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর পরবর্তী দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। মাগুরার বাসিন্দা দেবাশিষ বিশ্বাস জানান, গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আবার আসবে, তার ঠিক থাকে না। এতে তার সন্তানদেরও মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে থাকতে হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগের দিন পর্যন্ত কিছুটা জ্বালানি পাওয়া গেলেও পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ক্ষোভ কোথাও কোথাও সহিংসতায়ও রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ বিভাগের স্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন এলাকায় গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং কিছু স্থাপনা হামলার শিকার হচ্ছে।

এরই মধ্যে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এরিয়া অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ওজোপাডিকোর পক্ষ থেকেও পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী, অফিস ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সব বিতরণ প্রতিষ্ঠানকে লোড ম্যানেজমেন্ট বা লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে সমন্বয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় অতিরিক্ত এবং অন্য এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং না করে যতটা সম্ভব ভারসাম্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে কাগজে-কলমে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না এবং কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নানা কারণে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দেশের বড় একটি অংশের বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

দ্বিতীয়ত, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিছু অংশেও জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড়পুকুরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাবও জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে পড়ছে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া জমে থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক চাপও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

গত ২৮ জুলাই থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এক পর্যায়ে ১০ আগস্ট দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি অতীতের অনেক রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ওই দিন দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা অঞ্চলে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিভাগেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্যাস সংকটের মাত্রা বোঝা যায় পেট্রোবাংলার তথ্যেও। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলমের মতে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। তার মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সংস্থান বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে এবং ১২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরো সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকার শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের সময় আরও এগিয়ে এনেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সারা দেশের শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করতে বলা হয়েছে। আলোকসজ্জাও সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বুধবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে দেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়। এর আগে ১১ জুন জারি করা নির্দেশনায় শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি ছিল। নতুন নির্দেশনায় সেই সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়েছে।

শুধু দোকানপাট নয়, বিভিন্ন এলাকায় চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়সীমার আওতামুক্ত থাকবে।

সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সমস্যা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ও সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বড় ধরনের চাপে পড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গ্রাহকদের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লোড ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে সংকটের বড় অংশই গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে