এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বেসরকারি এমপিওভুক্ত অর্ধ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে যাচ্ছে শত বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সম্প্রতি শতবর্ষী স্কুল ও কলেজের তালিকা পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হচ্ছে—এমন খবরে তালিকায় নাম লেখাতে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে জোর তদবির। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ ও আবেদন জমা দিচ্ছেন। সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার বা সুপারিশের অনেক চিঠিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। এতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬ লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জাতীয়করণ করতে খসড়া তালিকায় রয়েছে প্রায় ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধে বান্দরবনের তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ তিনটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সরকারিকরণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এছাড়া শত বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকা গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছরে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা সরকারিকরণ করতে হলে এটি এমপিওভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটিতে প্যাটার্নভুক্ত শিক্ষক থাকা, শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো হওয়া, এলাকায় আর কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান না থাকার বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় সরকারিকরণের ক্ষেত্রে।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তীতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাউশি বোর্ডের মাধ্যমে একটি তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
দুই জন শিক্ষক নেতা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘লোকাল নেতাদের চাপে মন্ত্রি-এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সুপারিশ পাঠান। সুপারিশের ফলে অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠান যেন সরকারি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ বড় ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগলিক প্রয়োজন কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করা হলে তা সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতিমালা ছাড়া শুধু ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করা হলে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, প্রভাবশালীদের সুপারিশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের ফলে বৈষম্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের সংস্কৃতি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই প্র্যাকটিস ছিল। ঐ সময় তদবির-সুপারিশের ভিড়ে অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠান সরকারি হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জুলাই বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। বিএনপি সরকার গঠনের পর চলতি বছরের ২০ এপ্রিল বগুড়ার এক সমাবেশে গাবতলীতে অবস্থিত শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই ঘোষণার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে কলেজটি সরকারি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বর্তমানে এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ব
গুড়ার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় সরকারি করা হয় গত ২৫ আগস্ট। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত ২৭ আগস্ট বগুড়ার গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ‘গাবতলী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে সরকারিকরণ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। গত ২০ জুলাই ভোলার তিনটি প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- চরফ্যাশনের ফাতেমা-মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয়, চরফ্যাশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মনপুরার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়।