শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২২:৪৪

মামা বাড়ি থেকে বিতাড়িত সেই এতিম ছেলেটিই আজ বিশ্ব ফিনটেক তারকা!

মামা বাড়ি থেকে বিতাড়িত সেই এতিম ছেলেটিই আজ বিশ্ব ফিনটেক তারকা!

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বাবাকে হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন নানা বাড়িতে। সম্পত্তির ভাগ চাওয়ার আশঙ্কায় সেখান থেকেও বিতাড়িত হন। সেই তানভীরই আজ বৈশ্বিক ফিনটেক বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একটি ব্যাগ। সেই ব্যাগে ছিল কয়েকটি জামাকাপড়। কিন্তু তরুণ সৈয়দ তানভীর আহমেদের কাছে সেটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভারি বোঝা।

টিউশনি শেষে সেদিন মামার বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। বাসার কলাপসিবল গেটের বাইরে পড়ে থাকা ব্যাগটি দেখে প্রথমে থমকে যান। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারেন, ব্যাগটি তারই। ভেতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত। তাকে আর সেখানে থাকতে দেওয়া হবে না।

হাতে ব্যাগ নিয়ে সেদিন নানা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তানভীর। সামনে তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পেছনে পড়ে রইল এক টুকরো আশ্রয়স্থল, যেখানে তিনি ভেবেছিলেন, আপনজনদের কাছে অন্তত নিজের জন্য একটু জায়গা থাকবে। কিন্তু জীবনের সেই নির্মম অধ্যায়ই হয়ত তৈরি করে দিয়েছিল অন্য এক তানভীরকে।

বাবাকে হারিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে

কিডনি রোগে ভুগে বাবার মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই বদলে যায় তানভীরের জীবন। একে একে হারিয়ে যেতে থাকে নিরাপত্তার জায়গাগুলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতির্র প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে শুরু করেছেন টিউশনি। দিনের একটি অংশ পড়াশোনা, আরেকটি অংশ টিউশন, এভাবেই চলছিল জীবন। আশ্রয় হিসেবে জায়গা হয়েছিল নানা বাড়িতে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে তিনি ভেবেছিলেন, আপনজনদের মধ্যে থেকেই হয়ত নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে পারবেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।

মামাদের পরিবারের মধ্যে তৈরি হয় দূরত্ব। তানভীরের মনে হতে থাকে, তাকে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নয়, বরং একজন আশ্রয়প্রার্থী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কখনো ড্রয়িংরুমের এক কোণে রাত কাটিয়েছেন। কখনো টিউশনি ও কোচিং শেষে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে দেখেছেন, তার জন্য খাবার রাখা নেই।

একবার রমজান মাসে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তানভীর। বাসার সবাই যখন ইফতার করছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় রোজা রাখা সেই তরুণের সামনে ছিল না ইফতারের প্লেট।

ছোট ছোট এসব ঘটনা ধীরে ধীরে তাকে বুঝিয়ে দেয়, এ বাড়িতে তার জায়গাটি হয়ত আর নিরাপদ নয়। যে ব্যাগটি বদলে দিয়েছিল জীবন এরপর আসে সেই দিন। টিউশনি থেকে ফিরে গেটের বাইরে নিজের জামাকাপড় ভর্তি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন তানভীর। কথা বলতে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে আর সেখানে থাকতে দেওয়া হবে না। পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ কেউ এগিয়ে এসেছিলেন। এতিম ছেলেটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে আরো কিছুদিন আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

এ সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক পাওনা-পাওনির জটিলতা। তানভীরের বাবা তার মামাদের কাছে টাকা পেতেন। সেই পাওনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তানভীরের আশঙ্কা ছিল, বাবার পাওনা কিংবা মায়ের প্রাপ্য নিয়ে কথা বলাটাই যেন তার জন্য আরো বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান না পেয়ে নানা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। সেদিন হয়ত মনে হয়েছিল, সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সেদিনই খুলে গিয়েছিল অন্য একটি দরজা। 

পেছনে তাকাননি তানভীর

নানা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাননি সৈয়দ তানভীর আহমেদ। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষ করেছেন, এরপর এমবিএ করেছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে ছিল সংগ্রাম, কিন্তু থেমে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনের শুরু সেলস ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট দিয়ে।

প্রথম দিকে দায়িত্ব ছিল নতুন গ্রাহক খোঁজা, নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা, নতুন বাজারের সন্ধান করা। কিন্তু কাজ করতে করতে তার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে থাকে। তিনি শুধু ব্যবসা করার মানুষ হয়ে থাকেননি; শিখেছেন কীভাবে একটি বাজার তৈরি করতে হয়, কীভাবে ভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতা বুঝতে হয় এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাকে স্থানীয় বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হয়।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়িক বাস্তবতা তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে।

এক দশকেই বৈশ্বিক নেতৃত্ব

মাত্র এক দশকের কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক ফিনটেক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন তানভীর। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ডিবি ইনভেস্টিং-এর গ্লোবাল বিজনেস, স্ট্র্যাটেজি ও অপারেশনস-এর গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মিডল ইস্ট ও নর্থ আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের পাশাপাশি বর্তমানে বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের দায়িত্বও তার কর্মপরিধির অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বাজার তৈরি, কৌশল নির্ধারণ এবং অপারেশন পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার কাঁধে। অথচ একসময় এই তরুণের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল, পরদিন কোথায় থাকবেন, কীভাবে পড়াশোনার খরচ চালাবেন।

যে ছেলে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে টিউশনি করতেন, সেই ছেলেই আজ আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি করছেন।

আশ্রয় হারানো থেকে বিশ্বমঞ্চে

তানভীরের গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি হয়ত তার পদবি কিংবা কর্মক্ষেত্র নয়। বরং সেই রাত, যেদিন হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে তিনি নানা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।

সেদিন তিনি হারিয়েছিলেন একটি আশ্রয়। কিন্তু হারাননি নিজের ওপর বিশ্বাস। জীবনে প্রত্যাখ্যান এসেছে, অভাব এসেছে, একাকিত্ব এসেছে। কিন্তু সেগুলোকে থামার কারণ না বানিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে নিয়েছেন তিনি।

এক সময় যে তরুণের জন্য পরিবারের একটি ঘরের কোণও ছিল অনিশ্চিত, আজ তার কর্মক্ষেত্রের পরিধি ছড়িয়ে আছে একাধিক মহাদেশে। তার গল্প তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের ভেঙে না পড়ার গল্প। প্রত্যাখ্যানকে শক্তিতে পরিণত করার গল্প। আশ্রয় হারিয়েও নিজের জন্য পৃথিবীতে একটি জায়গা তৈরি করে নেওয়ার গল্প। জীবনের একসময় তানভীরের সামনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল একটি বাড়ির দরজা।

আজ তার সামনে খুলে আছে বিশ্বের অসংখ্য বাজারের দরজা। নানা বাড়ি থেকে বিতাড়িত সেই ছেলে সৈয়দ তানভীর আহমেদ আজ বৈশ্বিক ফিনটেক অঙ্গনে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে