শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯:৪৭

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে বিদেশে যেতে আগ্রহী হাজারো তরুণের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাজার খোলার আগেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

মালয়েশিয়া সরকারকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রায় এক মাস আগে প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ এখনো জানেন না কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

তথ্যের এই শূন্যস্থানই দখল করেছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচার, চাকরির আশ্বাস এবং দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করছেন। ফলে সরকারি ঘোষণার চেয়ে দালালের কথাই অনেকের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে। কিন্তু এই সতর্কবার্তার মধ্যেই কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালের কার্যক্রম থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণায় সরগরম চাকরির বাজার। তরুণরা ছুটছেন তাদের দেওয়া আশ্বাসে, সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে নয়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিদেশে চাকরিতে যাওয়ার শুরু থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত একজন কর্মীকে নিজ দেশেই নানা ধরনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিথ্যা আশ্বাস, তথ্য গোপন, যখন-তখন টাকা দাবি, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা পাসপোর্টের অপব্যবহারের অভিযোগও নতুন নয়।

এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্রের ওটিপি নিয়ে অভিযোগ। কর্মীদের অভিযোগ, এজেন্ট বা দালালের দাবি করা অর্থ পরিশোধ না করলে বিমানবন্দরে বহির্গমন ছাড়পত্রের ওটিপি পাওয়া যায় না। ফলে বিদেশে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও কর্মীকে অর্থ দিতে বাধ্য হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, কর্মীর পরিবর্তে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালের কাছে ওটিপি নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে একধরনের নতুন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

এসব অনিয়ম একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর বিভিন্ন স্তরে যথাযথ নজরদারি ও প্রয়োগের ঘাটতির কারণে অনেক অনিয়মই কার্যত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার রূপ নিয়েছে। আইন ও বিধিবিধান থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে অনিয়মের সংস্কৃতি যে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তার বড় উদাহরণ।

নাগরিককে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না দিলে শুধু প্রতারণার ঝুঁকিই বাড়ে না, সচেতন হওয়ার সুযোগও কমে যায়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের নিজস্ব ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের ধাপ প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ডেকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল একই তথ্য দ্রুত, সহজ ভাষায় এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা। কারণ সরকারি তথ্যের জায়গা ফাঁকা থাকলে সেই জায়গা অন্যরা দখল করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। কয়েক বছর পরপর নানা অভিযোগে বাজার বন্ধ হয়েছে, পরে সরকারের তৎপরতায় আবার খুলেছে। আবার অনিয়মের অভিযোগে বন্ধও হয়েছে। ভিসা কেনাবেচা, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ কর্মীকে। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত অনেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। কেউ কেউ আবার অনিয়মিত অবস্থায় থেকে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন।

এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। তালিকায় রয়েছে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের সঙ্গে ৬২টি এজেন্সি।

প্রশ্ন উঠেছে, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি কি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি তারা ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীনেই সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে?

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতায় সহযোগী এজেন্সিগুলো নিজেরা কর্মী পাঠাতে না পারা এবং প্রধান এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল থাকার অভিযোগ রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকায় থাকা কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ার শর্ত অনুযায়ী তিন বছর কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই। কারও কারও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতাই নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ছাড়পত্রের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ নির্বাচন করেনি; মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী তালিকা করেছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় কোন কোন বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়ারই নির্বাচন করার এখতিয়ার রয়েছে।

এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন কর্মী পাঠাতে প্রকৃত খরচ কত হবে। এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা না থাকায় বাজারে নানা ধরনের অঙ্ক ঘুরছে। বিদ্যমান সমঝোতা অনুযায়ী মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা মালয়েশিয়া প্রান্তের খরচ, অর্থাৎ অভিবাসন লেভি ও বিমান টিকিট বহন করার কথা। বাংলাদেশ প্রান্তে বিএমইটি ছাড়পত্রের নির্ধারিত ফি, মেডিকেল স্ক্রিনিং এবং রিক্রুটিং এজেন্সির নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ কর্মীর দেওয়ার কথা।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় কর্মীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারও বাজারে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে সরকার যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিবাসন ব্যয় ঘোষণা করেনি, সেখানে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য কীভাবে বাজারে অর্থ লেনদেনের ভিত্তি হয়ে উঠছে?

শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, সরকারি নির্ধারিত খরচ ও প্রকৃত খরচের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলে নতুন করে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, প্রধান ও সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত প্রধান এজেন্সিগুলোই কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে মূল এখতিয়ার পাবে। আর সহযোগী এজেন্সিগুলো বাংলাদেশে কর্মী সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত থাকবে।

কিন্তু এই কাঠামোটি সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে ৩৩৮ এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পরও চাকরিপ্রত্যাশীরা জানেন না কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কোন পর্যায়ে টাকা দেবেন এবং কোন সেবার জন্য কত টাকা দিতে হবে।

এর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থায় বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বোয়েসেলের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ঘোষণা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকার যেখানে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে পাঠাতে পারে, সেখানে বেসরকারি ব্যবস্থায় কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হবে কেন?

এই উদ্যোগ সফল হলে তা স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের মডেলটি সীমিত ১০ হাজার কর্মীর মধ্যেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থায়ও এর প্রতিফলন ঘটবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশের আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী কর্মীদের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে গিয়ে চাকরি খোঁজার কথা নয়। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমে বিদেশি নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র আসবে, এরপর সরকার অনুমোদন দেবে এবং বিএমইটির ডাটাবেজ থেকে কর্মী বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে বিএমইটির ডাটাবেজে নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আইনে ডাটাবেজে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। তখনই চাকরিপ্রত্যাশীরা এজেন্সির দপ্তরে যেতে পারেন।

বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে চাহিদাপত্র পাওয়ার আগেই কর্মী সংগ্রহ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরে বিএমইটি নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ফলে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

বিদেশে চাকরি প্রত্যাশীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও সম্ভাব্য কর্মীদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রচার-প্রচারণা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র টিটিসির মাধ্যমেও এ নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আইএলও সহযোগিতায় তৈরি ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট পোর্টাল চালু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চাকরিপ্রত্যাশী, নিয়োগকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি, বিএমইটি, মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বিত করার সুযোগ রয়েছে।

একজন চাকরিপ্রত্যাশী কোন দেশে কী ধরনের চাকরির সুযোগ রয়েছে, নতুন চাহিদা এসেছে কি না, কোন এজেন্সি কোন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কী খরচ হবে এবং কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এসব তথ্য এক জায়গায় পেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমতে পারে।

কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পোর্টালটির সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ, সহজ ব্যবহারযোগ্যতা এবং চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বিত তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকার পরও বাস্তবে অনেক চাকরিপ্রত্যাশী দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিলালাল বলেন, সরকারি সেবাগুলো যদি মানুষের দোরগোড়ায় থাকে, তাহলে চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন দালাল ও এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভর করবেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রামরুর গবেষণাতেও দেখা গেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন। অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন ওকুপের মতে, ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট পোর্টালের উদ্দেশ্য ছিল চাকরিপ্রত্যাশীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম করা। এটি দ্রুত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে প্রতারণা ও বঞ্চনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

চাকরিপ্রত্যাশীদের নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে ঢাকায় এসে অযথা অর্থ খরচের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে নয়, নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কারণ বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটি যদি একটি চক্রে পরিণত হয় বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা, চাহিদা তৈরি ও অর্থ সংগ্রহ এবং বাজার খুললে তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানো তাহলে পুরোনো সংকটই নতুন করে ফিরে আসবে।

শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি করলে চলবে না। কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মানদণ্ড।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু নতুন করে বাজার খোলার খবর নয়; এটি পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে আসার বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে জাপানের মতো নিয়মিত ও উন্মুক্ত ব্যবস্থায় যোগ্য সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য কর্মী প্রেরণের সুযোগ রাখা যায় কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

শ্রমবাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত কর্মী প্রেরণ চালু রাখতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কোনো অনিয়মের চাপের কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন নীরব বা নিষ্ক্রিয় হয়ে না পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

নতুন সরকারের নতুন অধ্যায়ের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের নেগোসিয়েশন ও কার্যকর তৎপরতার ওপর। আর সেই নেগোসিয়েশনের শক্তি নির্ভর করবে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর। অনিয়ম অব্যাহত থাকলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ কমিটির সভার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ধরনের বৈঠকে শ্রম নিয়োগের প্রক্রিয়া, খরচ, সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও কর্মী সুরক্ষাসহ খুঁটিনাটি বিষয় আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ বছর এখন পর্যন্ত যৌথ কমিটির সভা না হওয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও খুলবে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই কতটা ‘নতুন’।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে