বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ০৭:৩৬:১৯

নাসিকে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে তিন শ্রেণির ভোটার

নাসিকে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে তিন শ্রেণির ভোটার

তানভীর হোসেন: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট হবে আগামী ২২ ডিসেম্বর। স্থানীয় পর্যায়ের এ নির্বাচনটি এবার দলীয় প্রতীকে হওয়ায় জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ছে পুরোদমে। তবে তিন শ্রেণির ভোটারের ভোটেই মূলত ফল নির্ধারিত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিমত, নারী ভোটার, নতুন ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপরই নির্ভর করবে জয় পরাজয়। এ তিন শ্রেণির ভোটার দলীয় প্রতীক শুধু নয়, সঙ্গে ব্যক্তি ইমেজকে প্রাধান্য দিয়েও ব্যালটে সিল দেবেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৪ হাজার ১৮৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়ে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৯৩টি। প্রদত্ত ভোটের হিসাবে শতকরা ৬৯ দশমিক ৯২ ভাগ ভোট পড়ে। ভোটের মধ্যে ৬ হাজার ২৬৪টি ভোট বাতিল হয়। বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৯টি। ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৬ প্রার্থীর মধ্যে শামীম ওসমান (দেওয়াল ঘড়ি) ৭৮ হাজার ৭০৫ ও সেলিনা হায়াৎ আইভী (দোয়াত কলম) ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পান।

আগামী ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ভোটে ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ জন এবং নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯ জন। এবার নতুন ভোটার বেড়েছে ৭০ হাজার ৭৪২ জন। যার মধ্যে শহরে প্রায় ২৪ হাজার, সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ৩২ হাজার এবং বন্দরে ১৬ হাজার নতুন ভোটার।

গত ৫ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা ছুটে চলেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। দিনরাত চলছে গণসংযোগ ও প্রচারণা। সেখানেই প্রার্থীরা দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে গত কয়েকদিন প্রার্থীদের সঙ্গে প্রচারণায় দেখা গেছে ভোট প্রার্থনার নানা চিত্র। এর মধ্যে আইভীকে দেখা গেছে নারীদের বিশেষ সান্নিধ্যে। তবে তার প্রচারণায় দেখা মিলেছে সব বয়সী নারী-পুরুষকেই। তরুণদের মধ্যেও আইভীকে নিয়ে রয়েছে আগ্রহ। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া আইভী যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই নারীদের ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে কিংবা ফুলের নৌকা আর তোড়া দিয়ে আইভীকে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে পিছিয়ে ছিল না সাখাওয়াতও। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সড়ক মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করার পাশাপাশি চেষ্টা করেছেন অলিগলিতে যেতে। স্থানীয় নেতাদের নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ওয়ার্ডে যান তিনি। সাখাওয়াতের পক্ষে ছাত্রদলের প্রচুর নেতাকর্মীকে দেখা গেছে ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে যেতে।

তরুণ ভোটার:

গত কয়েকদিনে আইভী ও সাখাওয়াতের প্রচারণার সময়ে কথা হয় বিভিন্নজনের সঙ্গে। শহরের খানপুর ব্যাংক-কলোনি এলাকার নাহিন মোজতবা তোলারাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে সম্প্রতি স্নাতক শেষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। প্রথম ভোট দিতে শুধু প্রতীক না এখানে আমি ব্যক্তি বিশেষকেও দেখবো। কারা মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে পারবে তাদেরকেই পছন্দের শীর্ষে রাখবো।’

কিল্লারপুল এলাকার সাইফুজ্জামান জানান, তিনি এবার প্রথম ভোটার। বেশ উচ্ছ্বাস নিয়েই ভোট দিতে যাবেন যদি পরিবেশ সুষ্ঠু থাকে। প্রথম ভোটটি খুব ভেবে চিন্তে দেবেন তিনি। কাকে ভোট দেবেন প্রশ্ন করা হয়েছিল বন্দরের সোনাকান্দা এলাকার মেহেতাজ আক্তারকে। সাফ জবাব, ‘আমাদের এলাকায় যারা রাস্তাঘাট, ড্রেন করেছে এবং ভবিষ্যতে যারা এসব আরও ভালোভাবে করতে পারবো তাকেই দেবো।’

নারী ভোটার:

মঙ্গলবার সেলিনা হায়াৎ আইভী মহানগরের ২৫নং ওয়ার্ডে গেলে এলাকার লোকজন আইভীকে ভোট দেওয়ার আশ্বাস দেন। উত্তর লক্ষণখোলা এলাকার ৮০ বছরের নারী বেল বাহার বলেন, ‘মা’রে তরে ভোট দিতে অইলেও কেন্দ্রে যামু’। দক্ষিণ লক্ষণখোলা ট্রান্সমিটার ঘাটলা রোডের ৪৮ বছরের নারী আছমা বেগম বলেন, ‘মার্কার টাইম নাই উন্নয়নে আইভী চাই’।

কথা হয় সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকার সহিতুন নেছার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি তো মহিলা, তো মহিলারেই ভোট দেবো।’ সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ এনায়েতনগর এলাকায় যান আইভী। সেদিন তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন কপালে ও মুখে চুমু খান ৭০ বছর বয়সী সাবিকুন নাহার। যাওয়ার সময়ে আইভীকে বলেন, ‘মারে আইছস কষ্ট কইরা, তুই ক্যারে আইছস, আবার আবি তহন তরে মালা পড়ামু।’ সেদিন সখিনা মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে আসেন কয়েকজন নারী। আছিয়া সুলতানা নামের একজনের শখ ছিল আইভীর হাত ধরবে। নিরাশ করেনি তিনি। আইভীর হাত ধরেই বলে উঠেন, ‘যে হাতে আইভীর ছোঁয়া সে হাতে বেঈমানি হবে না, সিল পড়বে নৌকাতেই।’

তবে নারী ভোটারদের মধ্যে অন্য রকম বক্তব্যও পাওয়া গেছে। নিতাইগঞ্জ এলাকার সাবিকুন নেছা নামের ৫০ বছর বয়সী নারী বলেন, ‘অনেক তো হয়েছে। ১৩ বছর আইভী চেয়ারে ছিল। এবার বোধহয় মানুষ একটু ভেবে চিন্তে কাজ করবে।’ শহরের সিদ্ধিরগঞ্জ মিজমিজি এলাকার আছিয়া আক্তার জানান, ‘আইভী নৌকা কেন নিল? আমরা তো নৌকাকে পছন্দ করি না। সে কারণেই আইভীকে পছন্দ করলেও তাকে ভোট দেবো না।’

সংখ্যালঘু ভোট:

মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে সংখ্যালঘুদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোট রয়েছে। এই ভোট যার বাক্সে যাবে তারই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

আইভী সাখাওয়াতের বক্তব্য

এ বিষয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বিগত দিনে নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। আমি আশা করি এবারও নারীরা আমার সঙ্গে থাকবেন। আর যেখানেই যাচ্ছি প্রচুর নারীরা আমার কাছে আসছেন কথা বলছেন।’

তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের জন্য ইতোমধ্যে অনেক মাঠ আমরা উদ্ধার করেছি। খেলাধুলার মাঠ ঠিক রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর তরুণদের জন্য স্লোগান রয়েছে ‘নয় শঙ্কা নয় ভয় শহর হবে শান্তিময়’। সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ মানুষ হয়েই দলমত নির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ শহর আজ আদর্শ শহরে পরিণত হওয়ার পথে। সংখ্যালঘুদের জন্যও আমি অনেক কাজ করেছি। আশা করি সবাই আমার সঙ্গেই থাকবে।’

অপরদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন,‘নারীরা এ সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ। তারা নীরব বিপ্লব ঘটাবেন। এ শহর একটি আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে যা দেখে তরুণরা তো বটেই সবাই ক্ষুব্ধ। তরুণ ও নতুন প্রজন্মের ভোটাররা বেশ বিচক্ষণ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তারাই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মনে করি। তাছাড়া বিএনপির তো ৬০ ভাগ ভোট আছেই।’-বাংলাট্রিবিউন

১৫ ডিসেম্বর,২০১৬/এমটি নিউজ২৪ ডটকম/সবুজ/এসএ

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে